Weather Update: ভয়ঙ্কর সময় ! বর্ষায় বিলম্ব, প্রবল অনাবৃষ্টি, আগুন-গরম! আর কী কী চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি এ বছর?
Super El Nino : সুপার এল নিনো ২০২৬: কলকাতায় কি আরও বাড়বে গরম? দুর্বল হবে বর্ষা? কী বলছে WMO ও বিশেষজ্ঞরা

কলকাতা : বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা WMO-র সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। সংস্থার মতে, ২০২৬ সালের এল নিনো পরিস্থিতি অতীতের অন্যতম শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’-র রূপ নিতে পারে। এর জেরে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি এবং কৃষিক্ষেত্রে বড়সড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের উপর এর প্রভাব কতটা পড়তে পারে? গরম কি আরও বাড়বে? বর্ষা কি দুর্বল হবে? নাকি পরবর্তীতে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে?
এল নিনো নিয়ে কী বলছে WMO?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এল নিনো পরিস্থিতি। আগামী কয়েক মাসে এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
WMO-র মতে, এল নিনোর তীব্রতা ও সর্বোচ্চ প্রভাবের সময় নিয়ে এখনও কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও অধিকাংশ পূর্বাভাস মডেল বলছে, এটি অন্তত মাঝারি মাত্রার হতে পারে। এমনকি শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সাধারণত এল নিনোর সময় দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ, আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল ও মধ্য এশিয়ায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কলকাতার গরমের সঙ্গে কি সরাসরি যুক্ত এল নিনো?
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এল নিনো তৈরি হওয়া এবং কলকাতার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ার মধ্যে সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং সেভাবেই এগুলিকে দেখা উচিত। ভবিষ্যতে এই বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে কী হতে পারে, তা সময়ই বলবে। অনেকে মনে করছেন, এই মুহূর্তে কলকাতায় সরকারি হিসেবে তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভের পরিস্থিতি নেই। কারণ কোনও এলাকাকে হিটওয়েভ বলতে গেলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে যেতে হবে অথবা স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ ডিগ্রি বেশি হতে হবে। তবে বাস্তবে শহরবাসী যে অসহনীয় গরম অনুভব করছেন, তার পিছনে রয়েছে একাধিক স্থানীয় কারণ।
কেন এত বাড়ছে কলকাতার অনুভূত তাপমাত্রা?
পরিবেশবিদ সুজীব করের মতে, কলকাতা কার্যত একটি “হিট আইল্যান্ড”-এ পরিণত হচ্ছে। শহরের অতিরিক্ত দূষণ, ধুলোকণা, কংক্রিটের আধিক্য, কমে যাওয়া জলাশয় এবং গাছপালার অভাব— সব মিলিয়ে শহরের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া সারা ভারতে এই বছর বিলম্বিত বর্ষা, অনাবৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রার পিছনের কারণটা অনেক বড়, যাকে বলা হচ্ছে সুপার এল-নিনো, যা সচরাচর হয় না, তবে যে বছর হয়, সে বছরটা মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে যায়। তাঁর বক্তব্য, কলকাতায় দূষণ অনেক বেশি। বাতাসে প্রচুর ধুলো কণা। প্রতিটি ধুলোকণা কিন্তু তাপ শুষে নিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সূর্য ডুবে গেলেও দূষণের ফলে ও ধুলোকণা থেকে তাপ বিকিরণের ফলে পরিবেশ ঠাণ্ডা হতে পারছে না।
এছাড়াও আরও কয়েকটি কারণ প্রকট হচ্ছে । শহরের হাজার হাজার এয়ার কন্ডিশনারও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসি ঘরের ভেতর ঠাণ্ডা রাখলেও বাইরে গরম হাওয়া ছাড়ছে। ফলে রাতের দিকেও শহর স্বাভাবিকভাবে ঠাণ্ডা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এই কারণেই কলকাতায় প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে।
এবার কেন অতি-দুর্বল হতে পারে বর্ষা?
সুজীব করের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এই সময়টাতে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১০ জুন নাগাদ এ দেশে বর্ষা পুরদস্তুর নামে। কিন্তু এবারে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ আরব সাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগর - এই অঞ্চলটার উপর দিয়ে অত্যন্ত উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। যেটাকে বলা হচ্ছে সুপার এল-নিনো। এই সুপার এল-নিনো প্রশান্ত মহাসাগর থেকে এসে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করছে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মাঝখান দিয়ে। এর ফলে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রা যেহেতু অনেকটা বেশি, তাই মৌসুমী বায়ু সক্রিয় হয়ে আন্দামান পৌঁছলেও শেষমেষ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে পারছে না। তাই এই রাজ্যে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে জলীয় বাষ্প পাচ্ছি না। তাই যেসব অঞ্চলে মেঘ জমছে, তার তুলনায় রোদের তেজ এতটাই বেশি, তাই কাঙ্খিত বৃষ্টিপাত পাওয়া যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অতিরিক্ত উষ্ণ স্রোত, তাই সেখানে একটা শক্তিশালী নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। সেই নিম্নচাপ উত্তর ও উ্ত্তরপশ্চিম বদিক থেকে বায়ুকে ডেকে আনছে। সেই বায়ু মূলত শুকনো গরম স্থলভাগের উপর দিয়ে আসছে। তাই তার মধ্যে কোনও জলীয় বাষ্প নেই, আর তাপমাত্রা অনেকটাই বেশি।
তৃতীয়ত, থর মরুভূমি অঞ্চলে নিম্নচাপ তৈরি হলে, তখন বঙ্গোসাগর থেকে বর্ষা ঢুকতে শুরু করে ভূমিভাগের মধ্যে। কিন্তু থরের তাপমাত্রা এখন যেমন আছে, তা মৌসুমী বায়ু এগনোর জন্য যথেষ্ট নয়। এখন থর মরুভূমির তাপমাত্রা মধ্যভারতের কিছু অঞ্চলের থেকেও তাপমাত্রা কম ! তাই যে নিম্নচাপ থর অঞ্চলে তৈরি হওয়ার কথা , তা মধ্য ভারতে তৈরি হচ্ছে। তাই Madden–Julian oscillation পদ্ধতি ঠিকঠাক কাজ করছে না। এই সব কারণে মৌসুমী বায়ু স্বাভাবিক ভাবে যেভাবে প্রবেশ করার কথা ও বৃষ্টিপাত ঘটানোর কথা , তা ঘটবে না। যথেষ্ট বৃষ্টি এবার হবে না।
এই পরিস্থিতিতে মৌসুমী বায়ু আন্দামান পর্যন্ত পৌঁছলেও সহজে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প দক্ষিণবঙ্গে ঢুকছে না। তাই মেঘ তৈরি হলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। সুজীব করের বক্তব্য, “এখন যেসব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, তা বর্ষার বৃষ্টি নয়। বরং এই ধরনের বৃষ্টি পরিবেশ ও শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
অনাবৃষ্টি থেকে খাদ্যসঙ্কটের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার শুরুতেই যদি অনাবৃষ্টি দেখা দেয়, তাহলে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং দক্ষিণবঙ্গের বড় অংশ জলসঙ্কট ও কম বৃষ্টির সমস্যায় ভুগতে পারে। সুজীব করের আশঙ্কা,
“যে সময় চাষবাস শুরু হয়, সেই সময়ই অনাবৃষ্টিতে ভুগবে এ রাজ্য ও উত্তর ভারতের একটি বড় এলাকা। এর ফলে খাদ্যসঙ্কট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।” তবে তাঁর মতে, ২৩ জুনের পর সূর্যের দক্ষিণায়ন শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তখন স্থলভাগ ও জলভাগে নিম্নচাপের জোড়া প্রভাবে বর্ষা অতিসক্রিয় হয়ে বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। এর ফলেও কৃষিক্ষেত্রে বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাময়িক বৃষ্টি মিললেও স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নয়
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কার মতে, বর্তমানে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গে যেসব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে, তাতে তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ৫ থেকে ৬ ডিগ্রি কমে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের গরম ফিরে আসছে। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কলকাতা একটি “পলিউশন বাবল”-এর মধ্যে অবস্থান করছে। এই দূষণস্তর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ঘটতে বাধা তৈরি করছে। ফলে সাময়িক বৃষ্টির পরও আর্দ্রতা ও অস্বস্তি থেকে যাচ্ছে।
এখনই আতঙ্ক নয়, কিন্তু সতর্কতা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার সময় নয়, বরং প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। জল সংরক্ষণ, শহুরে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিক্ষেত্রে বিকল্প পরিকল্পনা এবং আগাম আবহাওয়া সতর্কতা— এই চারটি বিষয় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। WMO-ও জানিয়েছে, আগাম মৌসুমি পূর্বাভাস ও Early Warning System প্রাণহানি কমাতে এবং অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।কলকাতা আপাতত বিচ্ছিন্ন ঝড়বৃষ্টি পেলেও, দীর্ঘমেয়াদে গরম, আর্দ্রতা, অনিয়মিত বর্ষা এবং চরম আবহাওয়ার প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।
এল নিনোর প্রভাব কোথায় কোথায় পড়ে ?
সাধারণত এল নিনোর সময় দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাংশ, আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত দেখা যায়। অন্যদিকে, মধ্য আমেরিকা, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে এল নিনোর উষ্ণ জলরাশি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়াতে পারে। তবে আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন তৈরির প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে এই আবহাওয়া পরিস্থিতি। তবে প্রতিটি এল নিনো একরকম নয়। এর প্রভাব নির্ভর করে তীব্রতা, স্থায়িত্ব, বছরের কোন সময়ে এটি তৈরি হচ্ছে এবং অন্যান্য জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে এর পারস্পরিক সম্পর্কের উপর। ফলে সব অঞ্চলে একই ধরনের প্রভাব পড়ে না।
আরও পড়ুন : বর্ষা বহুদূর! মনে হবে ফুটছে শহর! আবহাওয়ার কোন চক্রে কলকাতা? বোঝালেন আবহবিদ






















