Akash Deep: কুঁচকির যন্ত্রণা সহ্য করে দলকে জিতিয়েছিলেন, আকাশ দীপের অজানা গল্প শোনালেন কোচ
India vs England Test: এজবাস্টনে আকাশ সুযোগ পেতেই হোয়াটসঅ্যাপে গুরু শিষ্যের কথা হয়েছে। সৌতম মনে করেন, বুমরা ফিরলেও আকাশ ঝলমলেই থাকবেন।

সন্দীপ সরকার, কলকাতা: আকাশ দীপের (Akash Deep) বলে ব্রাইডন কার্সের শট আকাশে উঠে যেতেই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সৌতম মিত্রর। কে বলবে যে, আকাশ খেলছেন ইংল্যান্ডে, আর সৌতম বসে রয়েছেন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে কলকাতায়! সৌতমের মন যেন পড়ে ছিল বার্মিংহামের এজবাস্টন মাঠে।
শুভমন গিল বল তালুবন্দি করতেই ভারতীয় ক্রিকেটারদের উল্লাস শুরু হল মাঠে। সৌতম যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। চোখেমুখে স্বস্তি।
প্রিয় ছাত্র আকাশ দীপের দাপটে টেস্ট ম্যাচ জিতে সিরিজে সমতা ফেরাল ভারত। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট আকাশের। দুই ইনিংস মিলিয়ে ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে দলের জয়ের নায়ক। গর্বে বুক ভরে যাচ্ছে সৌতমের।
আকাশ দীপ। গত বছর রাঁচিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে (India vs England Test Series) টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। ইংল্যান্ড সফরের প্রথম টেস্টে একাদশে সুযোগ পাননি। এজবাস্টনে নেমেই কামাল। তাঁর গতি ও স্যুইংয়ের হদিশ পাননি ইংরেজ ব্যাটাররা। যশপ্রীত বুমরার অভাবও অনেকটাই ঢেকে দিলেন আকাশ।
ছাত্রের সাফল্য দেখে উচ্ছ্বসিত সৌতম। কলকাতায় এসে প্রথম যাঁকে কোচ হিসাবে পেয়েছিলেন আকাশ। যাঁর হাত ধরেই টেনিস বল ক্রিকেটের তারকার ডিউস বলে সাধনা শুরু। আকাশের অজানা গল্প শোনালেন সৌতম।
বলছিলেন, 'সালটা সম্ভবত ২০১৭। ভিডিওকন অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েছিল আকাশ। দুর্গাপুর থেকে এসেছিল। আমাদের অ্যাকাডেমিতে তখন টার্ফ ছিল না। কংক্রিটের উইকেটে কী জোরে বোলিং করেছিল। তবে একটু এলোমেলো ছিল। প্রথমে দেখেই ওকে ভাল লেগে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম, সঠিক পরিচর্যা হলে এ ছেলে অনেক দূর যাবে। বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার, আমার বন্ধু সঞ্জয় দাসকেও ওর কথা বলেছিলাম।'
সেই মরশুমেই ইউনাইটেড ক্লাবে সই করানো হয় আকাশকে। সৌতম বলছিলেন, 'রানা (বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার দত্তাত্রেয় মুখোপাধ্যায়), সাগরদের (সাগরময় সেন শর্মা) ওর কথা বলেছিলাম। ওরাও আকশকে খুব সাহায্য করেছে। আমি ওদের যখনই ডেকেছি, এসে বোলিং দেখিয়ে দিয়েছে। সাগর তখন বাংলার নির্বাচক। আমাকে বলেছিল, নির্বাচক হিসাবে কী করে দেখাই ওকে? আমি বলি, আগে তুই ক্রিকেটার, তারপর তো নির্বাচক। সাগর রাজি হয়ে যায়। আমাদের ক্লাবের প্র্যাক্টিস কখনও হতো ভিডিওকন মাঠে, কখনও ডালহৌসি মাঠে। সেখানেই প্রস্তুতি চলেছে আকাশের।'
আকাশের বাংলায় আসা কাকার সূত্রে। সৌতম বলছেন, 'ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আকাশ দুর্গাপুরে কাকার কাছে থাকত। ওখান থেকেই এসে ভিডিওকনে ভর্তি হয়। বাগুইআটি কেষ্টপুরে মেসে থাকত। আমাদের ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর আরজি কর হাসপাতালের কাছে ক্লাবের ক্রিকেট সেক্রেটারির ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠে। সেখানেই ক্লাবের ক্রিকেটারদের থাকার বন্দোবস্ত হয়। মাঝে কয়েকদিন আমার বাড়িতেও থেকেছে।'
বাংলা রঞ্জি দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলুন। সকলেই বলবেন, দলের জন্য নিজের জীবনও বাজি রাখতে পারেন আকাশ। আদর্শ টিমম্যান। লক্ষ্মীরতন শুক্ল, সৌরাশিস লাহিড়ী, সকলেই একমত। সৌতমের মুখেও শোনা গেল এরকমই গল্প। সৌতম বললেন, 'সেবার ইউনাইটেড ক্লাবের প্রায় অবনমন হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। রাজস্থান মাঠে উয়াড়ির সঙ্গে ম্যাচ ছিল। ওর কুঁচকিতে টান লেগেছিল। কিন্তু অবনমন বাঁচাতে ওকে লাগবেই। আমি বরফ আনিয়ে কুঁচকিতে লাগিয়ে মাঠে নামালাম। ৭ উইকেট নিয়ে ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছিল আকাশ।'
আরও বললেন, 'যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে সেবার লিগের প্রি কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ। এদিকে আকাশের বাড়িতে ভীষণ জরুরি কাজ ছিল। বলেছিল, স্যর ম্যাচের তৃতীয় দিন থাকতে পারব না। তিনদিনের ম্যাচের প্রথম দিন বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু শুধু ওই ম্যাচ খেলার জন্য আকাশ এসেছিল। দ্বিতীয় দিন খেলার পরই ওকে বাইকে চাপিয়ে হাওড়ায় পৌঁছে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করলাম। ওর খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার তারিফ করতেই হবে।'
খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ভীষণ সংযমী। সৌতম বললেন, 'মনে আছে, স্থানীয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ম্যাচ ছিল আমাদের। সেই ম্যাচের পর সকলের জন্য পার্ক স্ট্রিট থেকে রোল আনিয়েছিলাম। খেল না আকাশ। বলল, না স্যর তেল আছে।' যোগ করলেন, 'প্রথম থেকে দেখছি স্বাস্থ্য সচেতন ছেলে। মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলে। চিকেন স্টু ওর প্রিয় খাবার। গত মরশুমে রঞ্জি ট্রফির কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে এসে বলল, স্যর আপনার ফ্ল্যাটে যাব। আমি বললাম, আয়। এসে চিকেন স্টু খেল। বাড়ি গিয়েও ফোনে চিকেন স্টু-র রেসিপি জিজ্ঞেস করেছে আমার স্ত্রীকে।'
ইউনাইটেড ক্লাব যেমন তাঁকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মঞ্চ দিয়েছে, ফিরিয়ে দিয়েছেন আকাশও। একবার ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে কথা প্রায় পাকা। বাংলার হয়ে এক সময় খেলা বাঁহাতি পেসার সৌরভ মণ্ডল যোগাযোগ করেছিলেন আকাশের সঙ্গে। ইস্টবেঙ্গলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু শেষে লাল-হলুদ শিবির থেকে আকাশকে কোনও অ্যাডভান্স দেওয়া হয়নি। তাই ইউনাইটেডেই সই করেন। কিন্তু আকাশকে পাবেন না ধরে নিয়ে ততদিনে অন্য ক্রিকেটার নিয়ে ফেলেছিল ইউনাইটেড। ফের আকাশকে নেওয়ার টাকা কোথায়! মুশকিল আসান হয়ে দাঁড়ান আকাশ নিজেই। কোচ সৌতম মিত্রকে বলেন, 'স্যর যা দেবেন তাতেই খেলব।'
সৌতম বলছিলেন, 'একবার মোহনবাগানের প্রস্তাবও পেল। আমাকে জিজ্ঞেস করল, স্যর কত টাকার কথা বলব? শুনে বলি, টাকার কথা আমি কেন বলব? হেসে বলি, লোকে ভাববে আমার কাটমানি আছে। আসলে ও এরকমই। সহজ সরল। অনেককেই দেখেছি পরের পর্বে গেলে পাল্টে যায়। আকাশ এখনও একই আছে। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার কৃতিত্ব সম্পূর্ণ ওর। কোচ ক্রিকেটার তৈরি করতে পারে না। যদি প্লেয়ারের নিজের ইচ্ছে না থাকে। কঠোর পরিশ্রমী ছেলে আকাশ। তারই পুরস্কার পাচ্ছে।'
আকাশের সবচেয়ে বড় গুণ কী? 'পরিশ্রম করার ক্ষমতা। শেখার ইচ্ছে। ওকে সব সময় ব্যাটারদের সামনের পায়ে খেলাতে বলতাম। বলতাম, সামনে খেলালে ব্যাটার বুঝতে পারবে না কতটা স্যুইং হবে। ও মেনে চলত। রোজ প্র্যাক্টিসের শেষে একটা স্টাম্প পুঁতে সেটা লক্ষ্য করে বল করত। প্র্যাক্টিসের শেষে বাকিরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, শুধু অফস্টাম্প লক্ষ্য করে প্রায় আধ ঘণ্টা বোলিং করত। সেই পরিশ্রমের পুরস্কার পাচ্ছে,' বলছিলেন সৌতম। আরও বললেন, 'ব্যাটিংও ভাল করে। ব্যাট হাতে ম্যাচও জিতিয়েছে। ওকে ব্যাটিং অর্ডারের ওপরেও পাঠিয়েছি। দেবাঙ্গ গাঁধী তখন বাংলার নির্বাচক। বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় দাস দেবাঙ্গকে বলে আকাশকে ভিশনে নেওয়ার জন্য। আমিও বলি। সেখান থেকে ওর কেরিয়ার নতুন দিশা পায়।'
এজবাস্টনে আকাশ সুযোগ পেতেই হোয়াটসঅ্যাপে গুরু শিষ্যের কথা হয়েছে। সৌতম মনে করেন, বুমরা ফিরলেও আকাশ ঝলমলেই থাকবেন।




















