CPM News: ‘দলে ভয়ের পরিবেশ, গব্বর সিং আছে, কিছু বলা যাবে না’, প্রতীক উরের নিশানায় মহম্মদ সেলিম
Pratik Ur Rahaman Exclusive: এবিপি আনন্দ-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন প্রতীক উর।

কলকাতা: রাজ্য নেতৃত্বের কিছু ভাবনার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না বলে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন আগেই। এবার সরাসরি সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন প্রতীক উর রহমান। জানালেন, দলে ভয়ের পরিবেশ রয়েছে। কেউ কেউ দলের ঊর্ধ্বে উঠতে চাইছেন। প্রশ্ন তুললেই দলে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়। (Pratik Ur Rahaman Exclusive)
প্রতীক উরের সিদ্ধান্ত নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই তোলপাড় বাম শিবির। সেই আবহেই এবিপি আনন্দ-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন প্রতীক উর। সরাসরি সেলিমের নেতৃত্বগুণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। (CPM News)
প্রশ্ন: মহম্মদ সেলিমকে যে চিঠি লিখেছেন, তার মূল বিষয়বস্তু হল, রাজ্য নেতৃত্বের ভাবনার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না আপনি, গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক কী বিচলিত করেছে আপনাকে? কেন মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে?
প্রতীক উর: প্রথমেই, আমার দ্বন্দ্বটা তো দলের বিরুদ্ধে নয়! দলের অন্দরের কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা মতাদর্শকে সামনে রেখে, মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের ব্যক্তি-ইমেজকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। কেউ যখন প্রশ্ন করে, তাকে রাতারাতি কোণঠাসা করে দেওয়া হয়। সিপিএম দলের মধ্যে যে কথা প্রচলিত, মানুষ যা জানেন, আমি লবিবাজির শিকার। দিনের পর দিন দলের অভ্যন্তরে একাধিক ইস্যাুতে প্রশ্ন তোলার কারণে। অনেক নেতার শেখানো বুলি আওড়াতে পারিনি আমি। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সম্মেলনে একটা পক্ষের নেতা বলেছিল, 'অমুক নেতার পক্ষে তোমাকে হাত তুলতে হবে। হাত না তুললে ডায়মন্ড হারবার লোকসভায় কাজ করতে পারবে না'... আমি বলেছিলাম, কমিউনিস্ট পার্টি করতে এসেছিলাম কারও শেখানো বুলি বলার জন্য নয়, প্রশ্ন করার জন্য। যেটা ঠিক মনে হবে বলব। সেটাই বলেছি। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত দেখে নিতে পারেন, গোটা লোকসভা কেন্দ্রে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, অভ্যন্তরীণ বা প্রকাশ্য মিটিং। মাইনরিটি এলাকায় সভা হচ্ছে, আকরা, সন্তোষপুর, মহেশতলা, মেটিয়াবুরুজ, বজবজ- মাইনরিটিদের সমস্যা নিয়ে সভা, সেখানে আমি বক্তা নই। আমাকে ডাকা হচ্ছে না। কারণ নেতার শেখানো বুলি বলতে পারিনি।
বাংলা বাঁচাও যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। ভেবেছিলাম চুপ থাকব, এখন মনে হচ্ছে বলা প্রয়োজন। কোন নেতৃত্ব কোথায় থাকবেন, ঠিক হয়েছে। রাজ্য কমিটির গ্রুপে লিস্ট বেরোল। দেখলাম, লিস্টে সৃজন ভট্টাচার্যের নাম নেই। সৃজন আর আমি একসঙ্গে ছাত্র রাজনীতি করেছি। আমি মনে করি, প্রতীক উর রহমান ১০টা-১০০টা জন্ম নিতে পার। কিন্তু সৃজনের যা জ্ঞান, শব্দের উপর যা দখল, তা বহু দশক পর একজন জন্ম নেয়। সেই ছেলের নাম নেই তালিকায়। অনেক নেতার নাম আছে, নামী-অনামী, রাজ্য কমিটির সদস্য, সৃজনের নাম নেই। কেন? এই প্রশ্ন অপ্রিয়? এই প্রশ্নের কারণে টানা দু'বছর বসে আছি আমি। ছাত্র ফ্রন্ট ছেড়েছি। যুব করতে দেওয়া যাবে না। বলল, ইউনিট লোকাল করে উঠতে হবে। সমস্যা নেই। কিন্তু নিয়ম তো সবার জন্য সমান হবে? আমার জন্য নিয়ম হবে যে, সব ধাপ পেরিয়ে উঠবে। আর কিছু প্যায়ারের লোক একটা সংগঠন ছেড়ে অন্যটিতে সরাসরি নেতৃত্বে বসবে, এই দ্বিচারিতা কেন হবে? এই প্রশ্ন করা যাবে না?
আমাকে বলল গায়ে মাটির গন্ধ আছে, ক্ষেত মজুর করবে। রাজ্যস্তরের নেতৃত্বের কাজ করবে। আমি বললাম, সমস্যা নেই। কর্মী হিসেবেই কাজ করতে চাই, নেতৃত্ব দিতে হবে না। কিন্তু কাজের জায়গাটা যাতে পাই! রাজ্য় সম্মেলন হচ্ছে, রাজ্য কমিটির সদস্য তো বাদই দিন, আমাকে ডেলিগেট পর্যন্ত করেনি। এতটাই অযোগ্য হয়ে গিয়েছি কমিউনিস্ট পার্টিতে? দলে থেকে যদি প্রশ্ন করতে না পারি, আমাকে ব্রাত্য করে দেওয়া হবে? এটায় ব্যক্তিগত ভাবে প্রতীক উরের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক দ্বন্দ্ব যে, রোজ যা দেখছি ক'দিন ধরে, তার সঙ্গে স্বপ্নে দেখা কমিউন্সিট পার্টিকে মেলাতে পারছি না। কিছু প্যায়ারের লোক, কোটরের লোক, খাস লোক আছে, যাদের পরিমণ্ডলে উনি আবদ্ধ থাকেন। ওঁর শেখানো বুলি তারা বলে। শুধু রাজ্য সম্পাদক নন, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সম্পাদক আছেন, ওঁর কথাতেই দল চলবে, ইয়েস স্যর বলতে হবে। তবেই পদোন্নতি হবে। এটা স্বার্থান্বেষী নয়? এটা অনৈতিক নয়?
প্রশ্ন: আপনি তো দলের তরুণ তুর্কি, জনপ্রিয়তা রয়েছে। জনপ্রিয়তা কি দলের মধ্যে ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছিল? আপনাকে কোণঠাসা করে রাখা, যাতে উপরে উঠে আসতে না পারেন... এই ভাবনা কি তাড়িত করেছে আপনাকে?
প্রতীক উর: কখনও ভাবিনি আমি ভীষণ জনপ্রিয়। দলের সর্বক্ষণের কর্মী ছিলাম। সর্বক্ষণ দলের কাজ করতে চেয়েছিলাম। জনপ্রিয়তা মানুষ দিয়েছেন। পার্টির ট্যাগ ছিল বলেই জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছি আমি। কোন কারণে আমাকে আলাদা করে দেওয়া হল? এর আগে রাজ্য সম্পাদক ছিলেন সূর্যদা (সূর্যকান্ত মিশ্র)। মিটিংয়ে ঢেলে সমালোচনা করেছি। কাছে ডেকেছেন। বললেন, 'কী হয়েছে বলো আমাকে।' বলেছি যে, এটায় সমালোচনা প্রয়োজন মনে হয়েছে, করেছি। তার পর দিন ডেকে বললেন, 'ওই বইয়ে পড়েছি, তুমি যে লাইন বলেছো, সেটা ঠিক। কিন্তু নতুন ভাবনাটা দেখতে পারো।' এটাই তো রাজ্য সম্পাদকের কাজ, নেতার কাজ! আমি সমালোচনা করলে গ্রহণ করবেন, ভুল হলে শুধরে নেবেন। কিন্তু সৃজন নেই কেন বলে যখন প্রশ্ন করেছি, বললেন, 'জনপ্রিয়তার জামা পরানো হয়েছে তোমাদের গায়ে। জনপ্রিয়তার বড় আলখাল্লা। তুমি সারাজীবন যতই জিম করো, ওই আলখাল্লায় ফিট হতে পারবে না।' কী উত্তর এটা?
প্রশ্ন: তাহলে আপনাদের জনপ্রিয়তা কি ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছে কারও কারও কাছে?
প্রতীক উর: আমি জানি না। আমি নগণ্য ব্যক্তি। যদি ঈর্ষারই কারণ হচ্ছে, বলতে পারত। অন্তরালে চলে যেতাম। কিন্তু আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে কালিমালিপ্ত করতে কোথাও কোথাও বলা হল, ডায়মন্ড হারবার থেকে চিঠি দেওয়া হল আমার বিরুদ্ধে যে, সেটিং করে রাজনীতি করে ও। ৮৪ খানা কেস। ছ;-সাতবার মৃত্য়ুর মুখ থেকে ফিরে আসা, বাবার কাজ…তার পরও এসব শুনতে হবে? গোটা রাজ্যে দৌড়ে বেরিয়েছি, বাড়িতে স্ত্রী-মেয়ে অসুস্থ হয়েছে। কোনও দিন খোঁজ রাখতে পারিনি, স্বাভাবিক, অপরাধবোধ নেই। কিন্তু তার পরও সেটিং করে রাজনীতি করি শুনতে হবে?
প্রশ্ন: কার সঙ্গে সেটিং?
প্রতীক উর: তৃণমূলের সঙ্গে নাকি সেটিং করি আমি। ডায়মন্ড হারবার থেকে করেছে। যারা করেছে, এখন মনে হচ্ছে, ভায়া জেলা, ভায়া রাজ্য না হলে তারা এই সাহস পেতেন না। চিঠি দিলেন ঠিক আছে। অভিযোগ থাকতেই পারে। আমাকে জিজ্ঞেস করুন! আমার ক্যাডারদের সামনে বলছে, 'তোর নেতা কোথায়? তোর নেতা কেস খেয়েছে।' কেন? আপনি কমিউনিস্ট পার্টির গাইডলাইন মেনে কাজ করছেন? বলছেন, 'মিটিংয়ে সমালোচনা করে নেব, তুমি শুনে নাও।' তার মানে তো পরোক্ষ ভাবে স্বীকার নিলাম যে আমি সেটিং করছি? আমি বলালম, কমিশন হোক। কোনও উত্তর নেই।
প্রশ্ন: লোকসভা নির্বাচনে আপনি তো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন? সেটিং হল কী ভাবে?
প্রতীক উর: আমি জানি না। কিন্তু যে বা যারা হুমায়ুনের সঙ্গে যখন বসতে যায়, সেটায় সেটিং থাকে না। নিজে সাংসদ বিধায়ক হওয়ার জন্য শাসকদলের নেতা-ঘনিষ্ঠদের থেকে কোথাও সেটিং, কোথাও টাকা নেয়, সেটা সেটিং হয় না? আর আমি যখন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করি, সেটা সেটিং? আসলে সেটিং কথাটা বলা হচ্ছে ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে কালিমালিপ্ত করতে। লড়াইটা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতর লড়াই। সেখানে মতাদর্শ আসছে, প্রশ্ন আসছে, সংগঠনের প্রশ্ন তো অবশ্যই আছে। তাতেই হয়ত অপ্রিয় আমি। ধরে নিন, আমি খুব অবাধ্য ছেলে। আমি তো রাজ্য সম্পাদককে চিঠি দিয়েছি। আজ রাজ্য কমিটির মিটিং। আপনি একবারও ফোন করতে পারলেন না? এটা কি আপনার ঔদ্ধত্য? হুমায়ুনের সঙ্গে মিটিং করার সময় আছে, এক্স রাজ্য কমিটির সদস্যের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই আপনার? তাহলে কি আপনারা চান না আমি পার্টিটা করি? আমি তো পার্টি করতে চাই, চেয়েছিলাম। তাই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রপে দিয়েছিলাম, মিডিয়ায় দিইনি। সৃজন কেন নেই, কেন হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক হবে প্রশ্ন তুললেই কোণঠাসা করা হবে? এই দ্বিচারিতা কতদিন চলবে?
প্রশ্ন: দলের একাংশের মধ্যে নীতি নৈতিকতার অভাব দেখা দিচ্ছে বলছেন আপনি। এই একাংশের মধ্যে কি সেলিম পড়েন?
প্রতীক উর: আমার তো তাই মনে হচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা কী, কার মধ্যে কী আছে, তা তো আমি বলতে পারব না! কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকের যে দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল, আমার মনে হয়েছে, উনি সেটা যদি যথাযথ পালন করতেন, তাহলে হয়ত আজ এখানে বসে কথা বলতাম না আমি। আলিমুদ্দিনে রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে কথা বসতাম। দায়িত্ব ওঁর ছিল ডাকার, ডাকেননি। তাহলে কোথাও তো মনে হবেই। এটাই স্বাভাবিক। আদর্শের বিচ্যুতি কিনা, যাঁরা নেতৃত্বে রয়েছেন, ওই ঘরে আছেন, তাঁরা বলতে পারবেন। তাঁরা কেন চুপ আছেন, জানি না। তাঁদের প্রশ্ন করা উচিত। একটা ভয়ের পরিস্থিতি। গব্বর সিং আছে। কিছু বলা যাবে না। কিতনে আদমি থে-ও বলাও যাবে না। ওখানে 'সর্দার দো' বলা গিয়েছিল। এখানে বলা যাবে না। সর্দাররা যা বলবে, সাহেব যা বলবে, সেটাই করতে হবে। কী কালচার!
প্রশ্ন: প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছেন না?
প্রতীক উর: এতদিন তো বলিনি। প্রোটোকল মানতে বাধ্য ছিলাম।
প্রশ্ন: দলের ভিতরেও বলতে পারছেন না?
প্রতীক উর: কেউ বলতে পারছে না। সবাই ভয়ে আছে। এখুনি বোধহয় কাঁচি যাবে।
প্রশ্ন: তাহলে কি দমবন্ধ পরিস্থিতি?
প্রতীক উর: আমার কাছে অন্তত দমবন্ধ মনে হয়েছিল। বাকি কার কাছে কী জানি না। কেউ কেউ এনজয় করতে পারেন। জেনে রাখুন, সাহেবরা যাঁরা আমার কথা শুনছেন, এমন একটা প্রতীক উর নয়, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে, বুথে, ইউনিটে, হাজার হাজার প্রতীক উর প্রশ্ন তুলে কোণঠাসা হয়েছে। দলের জন্য এতদিন বলতে পারেনি। একদিন না একদিন মুখ খুলবে। সেদিন কিন্তু পালানোর পথ পাবেন না।























