Yemen's al-Zubaidi: ইয়েমেনে পর পর রকেট বর্ষণ, পালিয়ে গেলেন বিচ্ছিন্নতাকামী নেতা, অস্থিরতায় সৌদি এবং UAE-র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
World News: দক্ষিণ ইয়েমেনের বিরাট অঞ্চল সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল-ই নিয়ন্ত্রণ করছে।

নয়াদিল্লি: আমেরিকা ভেনিজুয়েলা আক্রমণ করার পর এবার ঘোর সঙ্কট পশ্চিম এশিয়ার আর এক দেশে। অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে গেলেন ইয়েমেনের সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের নেতা আইদারউস আল-জুবেইদি। তিনি কোথায় পালিয়ে গিয়েছেন, এখনও জানা যায়নি। সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোট মুহুর্মুহু রকেট বর্ষণ করেছে ইয়েমেন। তার পরই জুবেইদি পালিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। তবে তিনি এডেনে আছেন বলে দাবি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের। সেখানে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ১৫ রাউন্ড বোমাবর্ষণ করেছে বলে খবর। (World News)
দক্ষিণ ইয়েমেনের বিরাট অঞ্চল সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল-ই নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সেই সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের প্রধান জুবেইদি। তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্য়ানও ছিলেন। প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল আসলে ইয়েমেনের কিছু গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত, যারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকার হিসেবে কাজ করছিল এতদিন। (Yemen's al-Zubaidi)
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল-ই জুবেইদি-কে পদ থেকে অপসারণ করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তদন্তভার দেওয়া হয় অ্যাটর্নি জেনারেলকে। প্রথমে ঠিক ছিল, সটান সৌদি আরব চলে যাবেন জুবেইদি। সেই মর্মে সৌদি আরব আরব নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে বৈঠকও হয় প্রেসিডেন্ট রাশাদ-আল-আলিমির। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব যাওয়ার বিমানে ওঠেননি জুবেইদি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, জুবেইদির অনুগত সামরিক বাহিনীর গতিবিধি দেখে সন্দেহ জাগে তাদের। সেই মতো তাদের লক্ষ্য করে বোমা বর্ষণ করা হয়। প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় জুবেইদিকে। দেশদ্রোহিতার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে জুবেইদির রাজনৈতিক কেরিয়ার সমাপ্ত হতে চলেছে বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।
আইদারউস আল-জুবেইদি কে?
সেনার অফিসার থেকে এডেনের গভর্নর হন জুবেইদি। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সঙ্গে হাত মেলান। কিন্তু তিনি যে বড় কিছু করতে চান, তা স্পষ্ট বোঝা যায় ২০১৬ সালেই। দক্ষিণ ইয়েমেনের দিকে গোড়া থেকেই নজর ছিল জুবেইদির। সেই মতো সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল গঠন করেন, যারা ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাকামী আন্দোলনে মদত জোগায়। তাদের আবার আড়াল থেকে সাহায্য় জোগায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহি।
ইয়েমেনের রাজনীতির অন্যতম মুখ জুবেইদি, তাঁকে নিয়ে যদিও দ্বিধাবিভক্ত গোটা দেশ। ১৯৬৭ সালে জন্ম জুবেইদির। এডেনের গভর্নরও ছিলেন। দক্ষিণ ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব হাসিল করাই লক্ষ্য ছিল তাঁর। সেনায় থাকাকালীন বায়ুসেনার অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। তার পর স্পেশ্যাল সিকিওরিটি ফোর্সেও শামিল ছিলেন।
২০১৭ সালের ১১ মে থেকে সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাকামী আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। দক্ষিণ ইয়েমেন-কে পৃথক ও স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে বলে দাবি করে আসছিল তারা। ১৯৬৭ এবং ১৯৯০ সালে একত্রীকরণের আগে দক্ষিণ ইয়েমেন আলাদাই ছিল। ধীরে ধীরে দেশের বেশ কিছু আধা সামরিক বাহিনীর উপরও দখলদারি কায়েম করে সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল। একমাস আগে জুবেইদি হাদরামৌত এবং মাহার আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। আর তাতেই সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী তাঁকে রুখতে এগিয়ে আসে। তিনি না থামলে যুদ্ধ হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়।
বোমাবর্ষণের কবলে না পড়লে, জুবেইদি আর কোথায় যেতে পারেন, সেই নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। পার্বত্য এলাকায়, ইয়াফি, শাবওয়ার মতো এলাকায় আশ্রয় নিতে পারতেন। অথবা সশস্ত্র বাহিনী হুথি নয়ন্ত্রিত এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁরই ক্ষতি। কারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হুথি বরাবরই তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল। নতুন করে যোদ্ধাদের একত্রিত করে, ঘুরে দাঁড়ানো, সৌদির মোকাবিলা করা আর জুবেইদির পক্ষে সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন অনেকেই।
সৌদির হামলার তীব্র নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল। হামলায় অনেকে মারা গিয়েছেন বলে দাবি তাদের। পাশাপাশি, বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা। প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল আরও দুই মন্ত্রীকে অপসারণ করেছে, পরিবহণ মন্ত্রী আব্দুলসালাম হামিদ এবং পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রী ওয়ায়েদ বাধিবকে। তারাও সৌদি-জোটের হামলার নিন্দা করেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, জুবেইদিকে রুখতেই হামলা চালাতে হয় তাদের, অ্যথায় আল-ধালে-তে সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করত।
সৌদি আরব বনাম সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
ইয়েমেনে যে অস্থিরতা চলছে, তাতে সৌদি আরব এূবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তবে গত কয়েক বছরে সেই দ্বন্দ্ব শত্রুতায় পরিণত হয়েছে, যা হিংসাত্মক আকারও ধারণ করেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর ইয়েমেনের বন্দর শহর মুকাল্লায় বোমাবর্ষণ করে সৌদি। সেখানে আমিরশাহি থেকে বিচ্ছিন্নতাকামীদের জন্য জাহাজে করে অস্ত্রশস্ত্র এসে পৌঁছেছিল বলে জানা যায়, যা সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছেই যাচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও আমিরশাহির দাবি করে, সেখানে মোতায়েন নিজেদের সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো হচ্ছিল। যে হাদরামৌত থেকে যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালনা করে সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল, তা সৌদি সীমান্তেই অবস্থিত।
ইরান সমর্থিত হুথি সানা দখল করলে, ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ইয়েমেনে। হুথি-কে ঠেকাতে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে প্রবেশ করে সৌদি এবং আমিরশাহি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাদের মধ্যে মতবিরোধও বাড়তে থাকে। দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাকামী শক্তির প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করে আমিরশাহি, যা সৌদির স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। সীমান্তবর্তী ইয়েমেনকে সঙ্ঘবদ্ধ রাখতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে সৌদি।
গত ডিসেম্বর মাসে সেই সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে। আমিরশাহি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের তৈল সমৃদ্ধ এলাকাগুলি এক এক করে দখল করতে শুরু করে, যার পাল্টা জবাব দিতে নেমে পড়ে সৌদিও। মুকাল্লায় অস্ত্রশস্ত্রের উপর হামলার পর ইয়েমেন থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণাও করে আমিরশাহি। তাদের দাবি ছিল, ইয়েমেনের বৈধ সরকার এবং সৌদির অনুরোধেই তারা সেখানে পা রাখে। ইয়েমেনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অনেক আত্মত্যাগও করেছে আমিরশাহি।
কিন্তু গত শুক্রবার ইয়েমেন উপকূলে নিজেদের নৌবাহিনী মোতায়েন করে সৌদি। তাদের দাবি ছিল, ইয়েমেনে 'শান্তিপূর্ণ' অভিযান চালাচ্ছে তারা, যাতে আমিরশাহি সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাকামীদের দখলে থাকা অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধার করা যায়। যদিও তাদের এই দাবি খারিজ করে দেন বিচ্ছিন্নতাকামীরা। তাঁরা জানান, আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করছে সৌদি। বরং উত্তর বনাম দক্ষিণের দ্ধে মদত জোগাচ্ছে তারা। পাশাপাশি, সৌদির বিরুদ্ধে বারংবার বোমা বর্ষণের অভিযোগও তোলা হয়। শেষে, শুক্রবার গণভোটের ঘোষণা করে জুবেইদির বিচ্ছিন্নতাকামী সংগঠন সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল। দক্ষিণ ইয়েমেনের বাসিন্দারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য ঠিক করবেন বলে জানানো হয়। তাতেই নতুন করে তেতে ওঠে পরিস্থিতি।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ কী?
এমন পরিস্থিতিতে ঘোর সঙ্কট নেমে এসেছে ইয়েমেনে। গত একশতকেরও বেশি সময় ধরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ইয়েমেন। ১৯১৮ সালে অট্টোমানদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে উত্তর ইয়েমেন। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের অধীনে ছিল দক্ষিণ ইয়েমেন। দীর্ঘ ২৩ বছর পৃথক ভাবে অবস্থানের পর ১৯৯০ সালে তাদের একত্রীকরণ ঘটে। কিন্তু ১৯৯৪ সালেই গৃহযুদ্ধ নেমে আসে, যাতে দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাকামীরা পরাজিত হন। সেই ক্ষোভ আজও মেটেনি এবং প্রায়শই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে সৌদির দক্ষিণে অবস্থিত ইয়েমেন। ফলে সমুদ্রপথে যত ব্যবসাবাণিজ্য হয়, তা ইয়েমেনের গা ঘেঁষেই সৌদিতে ঢোকে। সেই ইয়েমেন অশান্ত থাকার অর্থ বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়বে। ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন হুথি-ও একাধিক দেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এর আগে রিয়াধ এবং আবু ধাবি, দুই পক্ষকে লক্ষ্য করেই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা চালায় তারা। সৌদি ও আমিরশাহির সংঘাতে তারাও সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিমি দুনিয়া কী অবস্থান নেয়, সেদিকেও নজর আন্তর্জাতিক মহলের।























