Rahul Arunoday Banerjee : যে হাসিটা চির অমলিন...

সুমন দে
কী বলব জানিনা !
বহু বছরের অভ্যেস, কোনও লেখা খুব ভালো লাগলে, সপ্তাহশেষে আবার পড়ার জন্য রেখে দিই... গতকালই আমার স্ত্রী আনন্দবাজার রবিবাসরীয়তে ছাপা একটা পুরনো লেখা পড়ে বলল , "কী করে এই লেখাটা মিস করে গেলে ?অসাধারণ...পড়ে দেখো!"
লেখকের নাম রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাহুলের সঙ্গে পরিচয় তো আজকের নয় । ওর প্রথম ফিল্ম সমস্ত রেকর্ড ভেঙে সুপারহিট হওয়ার পর, আমার ‘হ্যালো ভিআইপি‘-শোতে অতিথি , রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা। সদ্য রাজ চক্রবর্তীর ফিল্ম "চিরদিনই তুমি যে আমার..." তার আগের বাংলা ছবির সমস্ত বক্স অফিস রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে ! মোহরকুঞ্জে সাক্ষাৎকারটা শেষ হওয়ার পর মনে হল, আহা সময়টা বোধহয় সত্যিই বদলালো...এইরকম সহজ-সরল চনমনে দুটো ছেলেমেয়ে বক্স অফিস কাঁপানো নায়ক নায়িকা হয়েছে আর মানুষ তাদের নিয়েছে -- এটাই তো বাংলা ছবির সাবালকত্বের আসল পরিচয়।
তারপর বছর গড়ালো..রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা বিয়ে করল। সেই বিয়ে কেন এবিপি আনন্দ কিঞ্চিৎ ‘বেশি’ দেখিয়েছে -- সেই নিয়ে কিছু ছিদ্রান্বেষী মানুষ বিতর্ক করেছিল যথারীতি! যথারীতি আমি পাত্তাই দিইনি। তার কয়েক বছর পর সাউথ সিটি মলে হঠাৎ দেখা ! রাহুলই সম্ভবত বাংলা ছবির একমাত্র নায়ক যে সম্পূর্ণ ম্যাড়ম্যাড়ে সাদামাটা পোশাকে চামড়ার চপ্পল পায়ে সাউথ সিটি মলে অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারে! দুহাত ধরে বলল, "আমাদের ছেলে হয়েছে সুমনদা, নাম রেখেছি-সহজ।" এত ভালো লেগেছিল সেদিন...
সেই রাহুলই যখন পডকাস্ট শুরু করল, কী চমৎকার নামটা দিল - ‘সহজ কথা‘! বহুবার সেই সহজ কথায় আমায় ডেকেছে এবং পেশাগত বাধ্যবাধকতার কারণে যেতে পারিনি...ওকে ‘না‘ বলতেও খারাপ লেগেছে । আমার ‘মহাযুদ্ধ‘ থেকে ‘যুক্তি-তক্কো‘ অনুষ্ঠানের রাহুল নিয়মিত অতিথি। অসাধারণ বলত আর অনুষ্ঠান শেষ হলেই কাঁচুমাচু মুখে বলত,"সুমনদা আজ খুব ঝুলিয়েছি না?"
ভন্ডামো আর সেফ খেলার এই বাজারেও, রাহুল কোনওদিন বামপন্থায় তার বিশ্বাস গোপন করেনি -- না লেখায়, না বক্তৃতায় । সামনের মাসে ‘যুক্তি-তক্কো‘-র অন্যতম বক্তা ছিল রাহুল। শো-টা হবে, কিন্তু নিতান্ত গোবেচারা মুখে জ্বলন্ত দৃষ্টি আর ভীষণ রকম তীক্ষ্ণ কটাক্ষগুলো আর থাকবে না সেই অনুষ্ঠানে। কী বলব এটাকে রাহুল ? এইটা হল সত্যিকারের ‘ঝুলিয়ে দেওয়া‘ ... আমাদের মত গুণমুগ্ধ সবাইকে...
ওর অভিনয়ের গুণমুগ্ধ তো সবাই , আমি অবশ্য বেশি ভক্ত রাহুলের লেখার । সালটা সম্ভবত ২০১৮। আজকের মত এমনই রবিবারের এক সকাল। ‘সংবাদ প্রতিদিন‘-এর ‘রোববার‘ পত্রিকায় একটা লেখা একেবারে নজর কেড়ে নিল। প্রচ্ছদকাহিনী - কলোনি । লেখার নাম -‘ শুধু যাওয়া আসা‘। লেখকের নাম - অরুণোদয়। শুধু অরুণোদয়। সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ-এ জিজ্ঞেস করলাম। উত্তর এলো-"Din bhalo hoye gelo Suman da. Tumi porechho amar khub anondo holo. Rahul" সেই শুরু । তারপর যেখানেই লেখা প্রকাশিত হয় রাহুল পাঠাতে ভোলে না।

কী অদ্ভুত অপার্থিব সমাপতন ! আজ ঠিক যে মুহূর্তে এই ভয়ংকর অবিশ্বাস্য খবরটা এলো, আমার হাতে ধরা আনন্দবাজার রবিবাসরীয়তে ওরই লেখা। কালো অক্ষরগুলোতে বলিষ্ঠ শিরোনাম - "যে ভোর চির অমলিন"...
লেখা ছাপিয়ে এগিয়ে আসছে সেই মুখটা ... যে হাসিটা চির অমলিন...

১৭ বছর আগে আমার প্রথম নেওয়া সাক্ষাৎকারে রাহুল বলেছিল , ওই বিজয়গড় এলাকা থেকে ও আর কোথাও কখনও যেতে পারবে না... আসলে রাহুল আমাদের ছেড়ে কোনওদিন কোথাও যেতে পারবে না। কোনও তালসারির জলস্রোতের সাধ্য নেই রাহুলকে কেড়ে নেয়।
বাঙালির শব্দে, বাঙালির ছবিতে - রাহুল ছিল, আছে, থাকবে । যে হাসিটা চির অমলিন...

























