Malda News: শেষ হয়েও হচ্ছে না শেষ, মালদার যুবকের শরীরে কোথা থেকে এল অগণিত সূচ! এক্স-রে দেখে স্তম্ভিত সকলে
Man with Needles in Body: মালদার কালিয়াচক থানার অন্তর্গত সুলতানগঞ্জ থেকে এই ঘটনা সামনে এসেছে।

অভিজিৎ চৌধুরী, কালিয়াচক: ‘মনের মধ্যে নিরবধি শিকল গড়ার কারখানা/একটা বাঁধন কাটে যদি, বেড়ে ওঠে চারখানা…’, ঢের আগেই লিখে গিয়েছিলেন কবি। কিন্তু রক্তমাংসের শরীরে আস্ত সূচের কারখানা কি আদৌ গড়ে ওঠা সম্ভব? চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে অসম্ভব। কিন্তু মালদার এক যুবকের শরীর এই মুহূর্তে সূচের কারখানায় পরিণত হয়েছে। অস্ত্রোপচার করে গুচ্ছ গুচ্ছ সূচ বের করা হলেও, আবারও তার শরীর সূচে ভরে গিয়েছে। পরিবারের দাবি, ‘কালাজাদু’র শিকার হয়েছে তাদের ছেলে। তুকতাক করে বাইরে থেকে শরীরের সূচ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাড়া-পড়শিরা আবার অশুভ শক্তির প্রকোপও দেখছেন। চিকিৎসক মহল থেকে প্রশাসন পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে এই ঘটনায়। (Malda News)
মালদার কালিয়াচক থানার অন্তর্গত সুলতানগঞ্জ থেকে এই ঘটনা সামনে এসেছে। সেখানকার মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সি মূক ও বধির যুবক হায়দর আলির। আসল বাড়ি কালিয়াচকের বাঁধন এলাকায়। মা সামিনা বিবি মারা যাওয়ার পর বাবা আলেপ শেখ আলাদা সংসার পাতেন। সেই থেকে মধ্যপাড়ায় মাসির বাড়িতে থাকেন তিনি। মূক ও বধির হওয়া ছাড়া হায়দরের শরীরে অন্য কোনও সমস্যা ছিল না। ছ’বছর আগে নাসিমা খাতুনের সঙ্গে বিয়ের সময়ও ঠিক ছিলেন তিনি। সমস্যা ধরা পড়ে বছর দেড়েক আগে। (Man with Needles in Body)
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বিয়ের দু’বছরের মধ্যে দু’বার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন নাসিমা। কিন্তু দু’টির একটিও বাঁচেনি, প্রসবের সময়ই মারা যায়। তাঁদের এক আত্মীয় মহম্মদ সাকির শেখ জানিয়েছেন, বছর দেড়েক আগে অসুস্থ হয়ে পড়ে হায়দর। যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন তিনি। সেই সময় মালদা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখানে এক্স-রে হয় হায়দরের, যার ছবি হাতে পেতেই চক্ষুচড়কগাছ হয় সকলের। কারণ ছবিতে দেখা যায়, হায়দরের হাতে, পেটে, পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সূচ বিঁধে রয়েছে, যেগুলি দেখতে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জের মতো।

X-Ray ছবিতে দেখা যাচ্ছে সূচ।
হায়দরের স্ত্রী নাসিমা জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের একটি নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচার হয় হায়দরের। সেখানে দুই দফায় হায়দরের পেট থেকে ৩৭টি সূচ বের করা হয়। চিকিৎসকরা সেই সূচ বের করে পরিবারকে দেখানও। কিন্তু হায়দরের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে পরিবার। নাসিমা জানিয়েছেন, ঘটিবাটি বিক্রি করে চিকিৎসা করিয়েছেন স্বামীর। আর সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় প্রশাসনের সাহায্য় ছাড়া আর উপায় নেই তাঁদের কাছে। স্বামীর শরীরে সূচ কী করে তৈরি হচ্ছে, বুঝতে পারছেন না নাসিমা। তাঁর বক্তব্য, “কালাজাদু আছে মনে হচ্ছে। প্রথমে ন’টি বের করেন, তার পর ২৮টি বের করা হয়। ছোট নয়, বড় সূচ। ডাক্তারও বলছেন আর অস্ত্রোপচার করতে পারবেন না তিনি। বাড়িতে সিসিটিভি বসাতে বলছেন। সিসিটিভি বসানোর টাকা কোথায়!” বিড়ি বেঁধে যা হোক করে চলছে, আর তিনি পারছেন না বলে দাবি নাসিমার। স্বামী যন্ত্রণায় ছটফট করেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আনারুল শেখ, যশোদা বর্মনরা বলেন, “জীবন্ত মানুষের শরীরে অসংখ্য সূচ বিঁধে থাকার কথা শুনিনি কখনও। ভাবতেই পারছি না আমরা। নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু ঘটছে।” যদিও এর নেপথ্যে ‘কালাজাদু’ বা অলৌকিক কারণ কিছু নেই বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের জেলা সম্পাদক মনোরঞ্জন দাস। তিনি বলেন, “প্রাথমিক ভাবে যা বুঝেছি, কালাজাদু বলে কিছু হয়নি। ওই যুবক মানসিক রোগী। আগে মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন ওঁর। অস্ত্রোপচার নয়, হোমে রেখে চিকিৎসা হোক ওঁর। হয় উনি নিজে অজান্তে এটা করছেন, বা কেউ এটা ঘটাচ্ছেন, যাতে প্রচারের আলোয় আসে এটা। জৈব রাসায়নিক পদ্ধতিতে শরীরে কারখানায় তৈরি লোহাজাত কিছু তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।”

স্ত্রী নাসিমার সঙ্গে হায়দর।
মালদা জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুদীপ্ত ভাদুড়ি বলেন, “ওই যুবক মাদকাসক্ত ছিল কি না দেখতে হবে। ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ নিয়ে নেশা করেন অনেকে। সেক্ষেত্রে শরীরে সূচ ঢুকলে প্রতিক্রিয়া রয়েছে। রোগীর মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখব আমরা। জেলা স্বাস্থ্য় দফতরের একটি দল ওঁর বাড়িতে যাবে।” এব্যাপারে একমত মালদার মুখ্য় স্বাস্থ্য আধিকারিক সুদীপ্ত ভাদুড়িও। তাঁর বক্তব্য, “মানবদেহে কখনও সূচ তৈরি হয় না। ওই যুবক মানসিক রোগী। তাই হয় তিনি নিজে সূচ ঢুকিয়েছেন, নয়ত সুস্থ করে তোলার নামে কোনও ওঝা বা ওই গোত্রের কেউ তাঁর শরীরে সূচ ঢুকিয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
মালদা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক পীযূসকান্তি মণ্ডল বলেন, “সূচ আপনা থেকে তৈরি হয় না শরীরে। অতীতেও দেখেছি কারও পেটে সূচ, কারও পেটে জেমস ক্লিপ। এক রোগী প্রায় ৭৫০ গ্রাম জেমস ক্লিপ গিলে নিয়েছিলেন। এগুলি মানসিক অসুস্থতার কারণে ঘটে। মালদার বহু জায়গায় এখনও কুসংস্কার রয়েছে। এই রোগী মূক ও বধির, মানসিক ভাবেও অসুস্থ। ওঝার কথায় তাঁকে সুস্থ করে তুলতে গিয়েও এমনটা করা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।” তবে হায়দরের অবস্থা জেনে শিউরে উঠছেন সকলে। পাড়া-পড়শিরা রীতিমতো আশঙ্কিত।






















