Malda News: মালদার মসনদে এবার কে ? মৌসমের 'ঘর ওয়াপসি', পুরনো 'গনি-ম্যাজিক' কি আদৌ ফ্যাক্টর হবে এবারের ভোটে
West Bengal Assembly Election 2026: মালদা কি এবার চাক্ষুষ করবে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ? ৪ তারিখে কি পুরনো গড় পুনরুদ্ধারে সক্ষম হবে কংগ্রেস? কী বলছে মালদার ভোটের হাওয়া?

দীপক ঘোষ, মালদা : আর ২ দিন পরেই ভোট মালদায় (Malda)। উত্তরবঙ্গের (North Bengal) এই জেলা বরাবরই রাজ্যে নিজের আলাদা পরিচিতি বজায় রেখেছে। মালদা মানে ফজলি আম, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সার দিয়ে থাকা আমবাগান। মালদা মানে গৌড়ের ইতিহাস। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের অনেকটা জুড়ে রয়েছে মালদা জেলা (West Bengal Assembly Election 2026)। তবে মালদা মানে কি শুধুই ইতিবাচক ব্যাপার-স্যাপার? নাহ্... মালদার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গঙ্গার ভাঙন। সময়ে সময়ে ভয়াবহ আকার নেয় মালদা জেলার এই সমস্যা। পাড় ভাঙে দ্রুত গতিতে। দুঃস্বপ্ন নেমে আসে আমআদমির জীবনে। হালফিলে আবার মালদার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে কালো টাকা, জাল নোট, রাজনৈতিক হিংসা, অস্তিরতাও। সাম্প্রতিক মোথাবাড়ির ঘটনা হোক বা অতীতের বহু ঘটনা - মালদা অনেক সময়েই ভয় ধরিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
ঘরের মেয়ের ঘর ওয়াপসি
সেই মালদাতেই প্রথম দফায় বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে আগামী ২৩ এপ্রিল। মালদায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর্চায় রয়েছেন মৌসম বেনজির নুর। ঘরের মেয়ের ঘর ওয়াপসি হয়েছে। আর এর জেরেই ফের মালদার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে এবং কংগ্রেস তার পুরনো গড় পুনরুদ্ধারে সফল হতে পারে বলে আশায় বুক বেঁধেছেন কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকরা। মালদার রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান না থাকলেও এ কথা কারও অজানা নয় যে উত্তরবঙ্গের এই জেলায় ম্যাজিকের অন্য নাম 'গনি ফ্যাক্টর'। সেই গনি খানের পরিবারের সদস্য মৌসব তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় হতাশা, ক্ষোভ একসঙ্গে সবই জন্মেছিল কংগ্রেস কর্মী-সমর্থক এবং মালদার সাধারণ মানুষের মনে। এবার ফের কংগ্রেসে ফিরেছেন মৌসম বেনজির নুর। মালতিপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটেও লড়ছেন। কোতোয়ালি বাড়ির মেয়ের ঘর ওয়াপসিতে খুশি মালদাবাসী। অনেকেই বলছেন, কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে গিয়ে ভুল করেছিলেন মৌসম। মালতিপুরের কংগ্রেস প্রার্থী নিজে কি বলছেন? মৌসমের কথায়, কংগ্রেসে ফিরে খুশি তিনি। যেভাবে কংগ্রেস পরিবার, মালদাবাসী, তাঁর পরিবার তাঁকে আবারও কাছে টেনে আপন করে নিয়েছে তাতে যারপরনাই খুশি মৌসম বেনজির নুর।
মালদার ভোটে বড় ফ্যাক্টর গনি-ম্যাজিক
এবার বিধানসভা নির্বাচনে ১২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে কংগ্রেস। মৌসম বলছেন, ১২টি আসন টার্গেট করেই এগোচ্ছেন তাঁরা। ভাল ফল হবে এ ব্যাপারে ১০০ শতাংশ আশাবাদী তিনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় কংগ্রেসে ফিরেছেন বলেই জানিয়েছেন মৌসম। মালতিপুর কেন্দ্র তাঁর জয়ের পিছনে কি ফের কাজ করবে 'গনি ম্যাজিক'? মালদাবাসীর বেশিরভাগই বিশেষ করে সাবেক কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, এখনও সেখানে ভালভাবেই বজায় রয়েছে গনি খানের প্রভাব। মালদার ভোটে কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমীকরণে 'গনি ফ্যাক্টর' আগেও ছিল, আজও আছে, আগামীতেও থাকবে - মত স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেরই। 'গনি খান হলেন মালদার পীরবাবা। ভোটে তাঁর ম্যাজিক থাকবে না?', মালদাবাসীর বেশিরভাগের মুখেই শোনা যাচ্ছে এই কথাই। গনি খান প্রয়াত হয়েছেন, মালদার রাজনীতিতে সামান্য হলেও ফিকে হয়েছে কোতোয়ালি বাড়ির প্রভাব - কিন্তু মালদার রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে মুছে যায়নি 'গনি ম্যাজিক'। বরং এখনও এই একটিই নাম মালদার রাজনীতিতে কংগ্রেসের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর, তুরুপের তাসও বলা যেতে পারে।
২০১৬- র বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে ঠেকাতে জোট বেঁধেছিল বাম-কংগ্রেস, বাম থেকে আবার বিজেপিতেও গিয়েছিলেন পরিচিত কমিউনিস্ট নেতা
জোটের ফায়দা কংগ্রেস ঘরে তুলতে পারলেও সেবারই রাজ্যে 'শূন্য' হয়ে যায় সিপিএম। ২০১৬- র বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ছিল কংগ্রেস-৮, তৃণমূল-৩ এবং বিজেপি-১. এই একটি আসন দিয়ে ১০ বছর আগে মালদায় উত্থান শুরু হয়েছিল বিজেপির। তারপর থেকে ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে বিজেপি। বাম দুর্গ ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন খগেন মুর্মু। ২০১৯ সালে এই খগেন মুর্মুকেই প্রার্থী করেছিল বিজেপি। সেবার খাতা খুলেছিল বিজেপি। এমনকী ২০২৪ সালেও তাঁর জয়ের ধারা অব্যাহত ছিল। এই প্রাক্তন কমিউনিস্ট নেতাই তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মালদায় বিজেপির মুখ। খগেন মুর্মুর কথায়, 'মানুষ তৃণমূলকে পশ্চিমবাংলা থেকে উৎখাত করতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন।' পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন একদা কংগ্রেসের গড় ছিল মালদা ছিল। বর্তমানে তা পুনরুদ্ধার চেষ্টাও করছে তারা। নিজের প্রাক্তন দল সম্পর্কে বলতে গিয়ে খগেন মুর্মু বলেন, একসময় মালদায় সিপিএমের গ্রহণযোগ্যতা ছিল বটে। তবে দিনে দিনে মানুষের ভরসা হারিয়ে সিপিএম। অন্যদিকে, তিনি এও বলেছেন, মানুষ এবার তাকেই ভোট দেবে যারা মানুষের স্বার্থে রাস্তায় নেমেছে। আর তৃণমূলের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বিজেপিই বলছে। তাই মানুষের ভরসা রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টিতে।
মালদার গত কয়েকবারের ভোটের পরিসংখ্যান (লোকসভা ও বিধানসভা)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জিতেছিল ১টি আসন। ২০২১- এর বিধানসভা নির্বাচনে ৪টি আসন ছিনিয়ে নেয় তারা। ২০২৪- এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন বজায় ছিল। অন্য একটি আসনে জেতেন কংগ্রেসের ইশা খান চৌধুরী। জোর ধাক্কা খায় তৃণমূল কংগ্রেস। মালদায় তৈরি হতে শুরু করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। মাথাচাড়া দেয় নতুন ফ্যাক্টর।
বিধানসভা নির্বাচনে মালদায় কেন্দ্র ১২টি
মালদায় বিধানসভা আসন ১২টি। সেগুলি হল হবিবপুর, মালদা, গাজল, চাঁচল, হরিশচন্দপুর, ইংরেজবাজার, মালতিপুর, মোথাবাড়ি, মানিকচক, রতুয়া, সুজাপুর, বৈষ্ণবনগর। ২০২৪- এর লোকসভা ভোটের ফলে দেখা গিয়েছিল বিধানসভা ভিত্তিক ফলে বিজেপি এগিয়ে ছিল ৬ আসনে (হবিবপুর, গাজল, মালদা, ইংরেজবাজার, মানিকচক এবং বৈষ্ণবনগর) এবং কংগ্রেস এগিয়ে ছিল বাকি ৬ আসনে (চাঁচল, মালতিপুর, রতুয়া, মোথাবাড়ি, হরিশচন্দ্রপুর এবং সুজাপুর)।
কী বলছেন মালদার পরিচিত নাম কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী
মালদায় একদিকে যেমন চলছে গঙ্গার ভাঙনে, ভাঙ্গা-গড়ার খেলা, তেমনই এই জেলার রাজনীতিতেও দেখা গিয়ে পরিবর্তিত সমীকরণ, যা শিকার করেছেন ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীও। একসময় বলা হত এই কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী 'গনি খান চৌধুরীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী'। পোড় খাওয়া এই রাজনীতিক এখন শাসক দলের সদস্য। দলের ভাল ফল নিয়ে আশাবাদী তিনি। তবে সংশয়মুক্ত নন। কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী বলছেন, 'লড়াই হবে। মুখ্যমন্ত্রী মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রচুর কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।' এসআইআর প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'প্রচুর বহিরাগত ঢুকে যাচ্ছে। আমি নাম করছি না, একপেশে পার্টি যারা করে, তারাই ঢুকে যাচ্ছে।'
এবার মালদার মসনদে বসবে কে
মালদা দূরে সরে যাচ্ছে বুঝেই এবার সেখানে সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়েছে তৃণমূল। মালদায় ঘাঁটি গেড়ে জনসভা, রোড শো করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিবির করে প্রচার চালিয়েছেন আশপাশের এলাকাতেও। মালদার মসনদে এবার কে বসবে, জবাব মিলবে ৪ মে। ২০২৬ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মালদায় নিজেদের দুর্গ রক্ষায় চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখছে না শাসক দল। অন্যদিকে, এবার মালদার ভোটে বাম-কংগ্রেস প্রত্যক্ষ জোট নেই, পরোক্ষে কোনও সমঝোতাও নেই। তাই বামেরাও নিজেদের মতো করেই এবার রয়েছে লড়াইয়ের ময়দানে। গত ২ বিধানসভা নির্বাচনে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে বামেদের। এবার তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভোটের লড়াইয়ের নিজেদের ভাঙ্গা-গড়ার মেরামত করতে ময়দানে সক্রিয় সিপিএম।




















