Aruna Shanbaug: নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি পেলেন হরীশ, নিজে সুযোগ না পেলেও, রাস্তা করে দিয়েছিলেন অরুণা
Harish Rana Case: অরুণা মৃতপ্রায় অবস্থায় বেঁচেছিলেন বলেই, হরীশ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সুযোগ পেলেন!

নয়াদিল্লি: দেশের ইতিহাসে প্রথমবার নিষ্কৃতিমৃত্যুতে সায়। হরীশ রানাকে চিকিৎসা থেকে মুক্ত করতে, তাঁকে দুঃসহ যাপন থেকে নিষ্কৃতি দিতে রাজি হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। হরীশের এই নিষ্কৃতিপ্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করে গিয়েছিলেন অরুণা শানবাগ। অরুণা মৃতপ্রায় অবস্থায় বেঁচেছিলেন বলেই, হরীশ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সুযোগ পেলেন বলে মনে করছেন অনেকেই। হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্য়ুতে অনুমোদন দিয়ে, সর্বোচ্চ আদালত যে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে, তাতে অরুণার অবদান স্মরণ করাচ্ছেন তাঁরা। (Harish Rana Case)
১৯৭৩ সালের ঘটনা। বম্বে তখনও মুম্বই হয়নি। আদতে কর্নাটকের বাসিন্দা অরুণা, কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালে জুনিয়র নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২৭ নভেম্বর কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার সময় হাসপাতালের রক্ষী সোহনলাল বাল্মীকির সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়েছিল অরুণার। সোহনলালের দাবি ছিল, তার ছুটির আবেদন পত্রপাঠ খারিজ করে দেন অরুণা। সেই নিয়ে বচসা চলাকালীন অরুণাকে চড় মারেন তিনি। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান। অরুণার উপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে সোহনলাল। (Aruna Shanbaug)
কিন্তু ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় অরুণার দেহ উদ্ধার হয়। চাপ চাপ রক্ত ছিল তাঁর চারপাশে। একটি টুলে ঠেসান দেওয়া ছিল তাঁর দেহটি। কুকুর বাঁধার শিকল গলায় বসেছিল চেপে। ডাক্তারি পরীক্ষায় জানা যায়, শিকল দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয় অরুণার। সেই অবস্থায় ধর্ষণ করা হয় তাঁকে। ওই ঘটনায় দোষী সাব্য়স্ত হয় সোহনলাল। অরুমাকে খুনের চেষ্টা, তাঁর ঘড়ি, কানের দুল চুরিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে।
বিশিষ্ট সাংবাদিক তথা লেখিকা, তথা মানবাধিকার কর্মী পিঙ্কি বিরানী পরবর্তীতে অরুণার হয়ে নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন জানান। পিঙ্কি জানান, ধর্ষণের জন্য দোষী সাব্য়স্ত করা হয়নি সোহনলালকে। কারণ যৌনাঙ্গ দ্বারা অরুণাকে ধর্ষণ করেনি সে, ধর্ষণ করেছিল পায়ুদ্বার দিয়ে। সহকর্মীরাই ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় অরুণাকে উদ্ধার করেন। কথা বলার চেষ্টা করলেও, মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না তাঁর। সংজ্ঞা হারান তিনি।
জানা যায়, এমন ভাবে অরুণার গলায় শিকল পেঁচিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনোই বন্ধ হয়ে যায়। চিরকালীন ক্ষতি হয়ে যায় অরুণার। চোখের দৃষ্টিশক্তি থাকলেও, মস্তিষ্ক ছবি ধরতে পরত না। এত রক্তক্ষরণ হয়েছিল, এত চোট পেয়েছিলেন যে মস্তিষ্ক কর্মক্ষমতা হারায়। ক্ষতি হয় মেরুদণ্ডের কশেরুকার, যাতে উদ্ভিজ্জ অবস্থায় চলে যান অরুণা। প্রাণবায়ু চললেও, কথাবার্তা, নড়াচড়া বন্ধ হয়ে নিস্তেজ হয়ে যান। আবেগ দেখানোর ক্ষমতা হারান। উদ্ভিজ্জ অবস্থায় চলে যায় শরীর।
ভিন্ন জাতের এক চিকিৎসকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলেন অরুণা। সেই নিয়ে পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধ ছিল। অরুণার সঙ্গে ওই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে জেনে প্রথম দিকে পরিবারের লোকজন ছুটে যেতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায়। আট ভাইবোনের কেউই আর অরুণার খবর নিতেন না। যদিও পরবর্তীতে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন অরুণার ভাইবোনেরা। তাঁদের দাবি ছিল, অরুণাকে নিয়ে যেতে তাঁদের উপর চাপসৃষ্টি করা হতো। তাঁদের সেই সামর্থ্য ছিল না। তাই যাওয়া বন্ধ করে দেন তাঁরা।
সেই পরিস্থিতিতে কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালের কর্মী এবং একদা সহকর্মীরাই অরুণার পরিবার হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ চারদশক অরুণার দেখাশোনা করেন তাঁরা। হাসপাতালের চিকিৎসক প্রতাপ দেসাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অরুণার। তিনি নিয়মিত দেখতে যেতেন অরুণাকে। পরবর্তীতে একটি সাক্ষাৎকারে প্রতাপ জানান, তিনি কথা বলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু অরুণার অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। ওই অবস্থায় অরুণাকে দেখতে পারতেন না তিনি। তাই ধীরে ধীরে নিজেকে ব্যস্ত করে তোলেন।
হামলার ৩৬ বছর পর, ২০০৯ সালে পিঙ্কির দায়ের করা অরুণার নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন গ্রহণ করে সর্বোচ্চ আদালত। মেডিক্যাল প্যানেল গঠন করা হয়। অরুণার অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে জানায় ওই প্যানেল। ২০১১ সালের ৭ মার্চ সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দেয় যে, লাইফ সাপোর্টে থাকা কারও জীবনে ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাঁর মা-বাবা, জীবনসঙ্গী বা কাছের আত্মীয়স্বজন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে ঘনিষ্ঠ কোনও ব্যক্তি বা বন্ধু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নিজেকে অরুণার বন্ধু বলে পেশ করেন পিঙ্কি। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাতে আপত্তি জানান। হাসপাতালের যে কর্মীরা প্রায় চার দশক অরুণার দেখভাল করেছেন, তাঁদের চেয়ে পিঙ্কি মোটেই ঘনিষ্ঠ হতে পারেন না বলে জানানো হয় হাসপাতালের তরফে। হাসপাতালের কর্মীরা জানান, তাঁরা অরুণাকে জীবিত দেখতে চান। তাই নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন খারিজ করার আবেদন জানান তাঁরা। ভবিষ্যতে মত বদল করলে হাসপাতালের কর্মীরা বম্বে হাইকোর্টে যেতে পারেন বলে সেই সময় জানায় সর্বোচ্চ আদালত।
২০১৪ সালে নিষ্কৃতিমৃত্যুর বিষয়টি পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠায় সর্বোচ্চ আদালত। সেই সময় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আদালতের দ্বারস্থ হয়। তারা যুক্তি দেয়, মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকার রয়েছে প্রত্যেক ব্যক্তির। কিন্তু সেই যুক্তি মানতে চায়নি কেন্দ্রীয় সরকার। এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে বলে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়। সেই সময় কেন্দ্র বলে, “প্রাণ কেড়ে নেওয়া নয়, প্রাণ বাঁচানোই কাজ চিকিৎসকের।” বিচারবিভাগ নয়, এই সিদ্ধান্ত সরকারের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে বলেও জানানো হয়।
২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত আক্রান্ত হন অরুণা। ২০১৫ সালের ১৮ মে শেষ পর্যন্ত মারা যান তিনি। হাসপাতালের কর্মীরাই তাঁর শেষকৃত্য সারেন। এর পর, ২০১৮ সালে সাংবিধানিক বেঞ্চের তরফে নিষ্কৃতিমৃত্যুকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকারে সিলমোহর পড়ে। পাশাপাশি, কিছু বিধিনিয়মও আরোপ করা হয়। সর্বোচ্চ আদালতের তরফে ‘Living Will’-এ অনুমোদন দেওয়া হয়, অর্থাৎ কৃত্রিম লাইফ সাপোর্টের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয় নাগরিকদের। সেই সময় সাংবিধানিক বেঞ্চ বলে, “জীবনের পবিত্রতা যখন নষ্ট হয়ে যায়, দরজা পেরিয়ে, মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার অনুমতি কি দেওয়া উচিত নয় আমাদের? কিছু মানুষের জন্য মৃত্যুই উদযাপনের মুহূর্ত হতে পারে।”
মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকারকে সামনে রেখেই হরীশের মা-বাবা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ছেলের সেবা করে আসছেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতিতে ছেলের কী ভবিষ্যৎ হবে, ছেলের দেখভাল করবে কে, আদালতে সেই প্রশ্ন তুলে ধরেন হরীশের মা-বাবা। শেষ পর্যন্ত বুধবার তাঁদের সেই আবেদন মঞ্জুর করল সর্বোচ্চ আদালত।
























