Cloudburst : ঘণ্টাখানেকের তছনছ করা বৃষ্টি, তুমুল দাপট, কলকাতায় ক্লাউডবার্স্ট? নাকি মাইক্রোবার্স্ট? দুইয়ের কী ফারাক?
জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে এখন সমতল ও উপকূলীয় শহরগুলিতেও ক্লাউডবার্স্টের বা মেঘ-ভাঙা-বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বিস্তারিত বলছেন, আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা

কলকাতা : ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বর্ষা যত দাপট বাড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে অতিভারী বৃষ্টির আশঙ্কা। বিশেষ করে পশ্চিমঘাট, হিমালয়ের পাদদেশ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বর্ষাকালে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করে। এর ফলেই কখনও কখনও সৃষ্টি হয় এক ভয়ঙ্কর আবহাওয়াজনিত ঘটনা— ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘভাঙা বৃষ্টি।
২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয়ের পর থেকেই "ক্লাউডবার্স্ট" শব্দটি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের । অনেকেই মনে করেন, এই ঘটনা শুধুমাত্র পাহাড়ি অঞ্চলে ঘটে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে এখন সমতল ও উপকূলীয় শহরগুলিতেও ক্লাউডবার্স্টের বা মেঘ-ভাঙা-বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। বিস্তারিত বলছেন, আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা
ক্লাউডবার্স্ট আসলে কী?
ভারতের আবহবিদদের মতে, কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় এক ঘণ্টার মধ্যে ১০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি হলে তাকে ক্লাউডবার্স্ট বলা হয়। সাধারণত এই বৃষ্টি ২০ থেকে ৩০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এর তীব্রতা বোঝাতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কলকাতা শহর সাধারণভাবে ১ ঘণ্টায় ১২ থেকে ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি সামাল দিতে পারে। সেখানে এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
কোথায় বেশি ঘটে ক্লাউডবার্স্ট?
এত দিন দেখা গিয়েছে, ক্লাউডবার্স্ট পাহাড়ি অঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। কারণ পাহাড়ের ঢালে আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে গিয়ে হঠাৎ প্রবল বর্ষণ ঘটায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমতল এলাকাতেও এই ধরনের ঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং বড় শহরগুলিতে দূষণের প্রভাবে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী বজ্রগর্ভ মেঘ (Supercell) তৈরি হচ্ছে, যা স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি নামাতে সক্ষম।
কীভাবে তৈরি হয় ক্লাউডবার্স্ট?
ক্লাউডবার্স্টের মূল কারণ হল বিশাল আকারের কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ। যখন প্রচুর পরিমাণ জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং উষ্ণ বায়ুর প্রভাবে দ্রুত উপরে উঠে যায়, তখন এই মেঘের সৃষ্টি হয়। পাহাড়ের ঢালে পৌঁছে সেই আর্দ্র বায়ু আরও দ্রুত উপরে উঠতে বাধ্য হয়। ফলে মেঘে বিপুল পরিমাণ জল জমা হয় এবং একসময়ে তা স্বল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টির আকারে নেমে আসে। কলকাতার মতো শহরে এই ঘটনা এখনও তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আবহাওয়া পর্যবেক্ষকদের একাংশের মত।
ক্লাউডবার্স্টের প্রভাব কতটা ভয়াবহ?
পাহাড়ি অঞ্চলে ক্লাউডবার্স্টের ফলে দেখা দিতে পারে—
- আকস্মিক বন্যা (Flash Flood)
- ভূমিধস (Landslide)
- হিমবাহ ভেঙে যাওয়া
- গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF)
- তুষারধস (Avalanche)
অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এর প্রভাব হতে পারে—
- ভয়াবহ জলজট
- যান চলাচল সম্পূর্ণ ব্যাহত হওয়া
- বিদ্যুতের খুঁটি ও তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
- শহরতলিতে মাটি ধস
- ব্যাপক সম্পত্তির ক্ষতি
ক্লাউডবার্স্ট কি শুধু বর্ষাকালেই হয়?
একেবারেই নয়। শক্তিশালী বজ্রঝড়, কালবৈশাখী কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময়েও ক্লাউডবার্স্ট হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ঘূর্ণিঝড় আমফানের সময় কলকাতার কিছু এলাকায় অস্বাভাবিক স্বল্পমেয়াদি অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা উল্লেখ করা হয়।
আগে থেকে কি ক্লাউডবার্স্টের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব?
বর্তমান প্রযুক্তিতে নির্দিষ্টভাবে ১-২ দিন আগে ক্লাউডবার্স্টের পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে এবং খুব ছোট এলাকায় ঘটে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), উন্নত রাডার প্রযুক্তি এবং উচ্চ-রেজোলিউশনের আবহাওয়া মডেলের সাহায্যে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল হতে পারে।
দূষণ কি ক্লাউডবার্স্ট বাড়াচ্ছে?
অনেক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বায়ুদূষণ ক্লাউডবার্স্টের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বায়ুমণ্ডলে থাকা দূষণকারী কণা জলীয় বাষ্পকে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখতে সাহায্য করে। ফলে মেঘে বিপুল শক্তি ও আর্দ্রতা জমা হতে থাকে। পরে যখন সেই মেঘ ভেঙে যায়, তখন অল্প সময়ে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টি এবং তীব্র বজ্রপাত দেখা দিতে পারে। কলকাতায় ২০২৫ সালে এমন কয়েকটি অস্বাভাবিক অতিভারী বৃষ্টির ঘটনা নিয়ে আবহাওয়া মহলে আলোচনা হয়েছিল।
আরও পড়ুন : কালবৈশাখীর সময় শেষ? শুরু বর্ষার বৃষ্টি ? দুইয়ের মধ্যে কী ফারাক? দাপটে এগিয়ে কোনটি? বললেন আবহবিদ
এল নিনোর প্রভাব
এল নিনো বছরে বর্ষার "ব্রেক" এবং "বার্স্ট" পর্যায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় শুষ্ক আবহাওয়ার পর হঠাৎ প্রবল আর্দ্রতা প্রবেশ করলে ক্লাউডবার্স্টের মতো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর ফলে আকস্মিক বন্যা, জলজট এবং শহুরে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ভবিষ্যতের বড় সতর্কবার্তা
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যত বাড়ছে, ততই পরিবেশের উপর মানুষের চাপও বাড়ছে। দূষণ, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে শুধু ক্লাউডবার্স্ট নয়, বরং মাইক্রোবার্স্ট-এর মতো আরও ভয়ঙ্কর স্থানীয় আবহাওয়া বিপর্যয়ের ঘটনাও বাড়তে পারে। মাইক্রোবার্স্টে ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব দেখা যায়, যা বিশেষ করে প্রাক-বর্ষার বজ্রঝড়ের সময় বেশি ঘটে। প্রকৃতিকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে এই ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ আকারে দেখা দিতে পারে— এমনটাই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।
Before You Go
MRC-র নতুন পরিষেবা, মিলবে রোবোটিক থেরাপি ও AI দ্বারা পরিচালিত মেডিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশনের সুবিধা























