Weather Update : বৃষ্টি হলেই মুহূর্মুহূ বাজ আর বিদ্যুতের ঝলকানি, যেন ক্লাউডবার্স্ট ! কলকাতায় হঠাৎ কেন এমন পরিস্থিতি?
ঘন ঘন বাজ পড়ার পিছনে কাজ করছে অনেকগুলি ভৌগলিক পরিস্থিতি ও আবহাওয়া বিষয়ক কারণ। জানাচ্ছেন, 'ওয়েদার আলটিমা'র কর্ণধার ও আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা।

কলকাতা : কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বর্ষাকালে এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি। অনেক ক্ষেত্রেই বজ্রপাতের তীব্রতা আগের তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতির পিছনে কী কারণ রয়েছে, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন আবহবিদরা।
বর্ষার বিরতির সময়ই বাড়ে বজ্রপাতের প্রবণতা
রবীন্দ্র গোয়েঙ্কার মতে, এখন বর্ষা বার্স্ট ও ব্রেকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই কখনও মাঝখানে এক-দু'দিনের জন্য বৃষ্টির বিরতি থাকে (Monsoon Break)। কখনও কখনও ২ থেকে ৭ দিনেরও বৃষ্টিবিরতি থাকছে। তখন কলকাতায় বজ্রপাতের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। কারণ, এই সময় সূর্যের তাপে শহরের ভূমি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুপুর ও বিকেলের দিকে সেই তাপ বায়ুমণ্ডলকে অত্যন্ত অস্থির করে তোলে। শুধু তাই নয়, কলকাতায় ঘন ঘন বাজ পড়ার পিছনে কাজ করছে অনেকগুলি ভৌগলিক পরিস্থিতি ও আবহাওয়া বিষয়ক কারণ। জানাচ্ছেন, 'ওয়েদার আলটিমা'র কর্ণধার ও আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা।
শহরের কংক্রিটই বাড়াচ্ছে তাপ
কলকাতার বিস্তীর্ণ কংক্রিটের রাস্তা, বহুতল এবং বিভিন্ন নির্মাণ সারাদিন সূর্যের তাপ শোষণ করে রাখে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই তাপ ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে Urban Heat Island Effect বলা হয়। এর ফলে শহরের উপরিভাগের বাতাস আরও অস্থিতিশীল হয়ে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরির পরিবেশ তৈরি করে।
দূষণের কণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে
আবহবিদের মতে, কলকাতার উপর জমে থাকা দূষণের স্তর বা Pollution Bubble-এ থাকা ধূলিকণা, অ্যারোসল এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম কণা মেঘের ভিতরে চার্জ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সক্রিয় করে। ফলে মেঘের মধ্যে ঘর্ষণ বাড়ে এবং বজ্রপাতের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া আরও বড় একটি ভৌগলিক অবস্থানগত কারণও এর জন্য দায়ী।
নিরক্ষীয় অঞ্চলের মতো পরিস্থিতি
রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা জানান, জুন - জুলাই মাসে বর্ষাকালে বিশেষ করে Monsoon Break-এর সময় সকাল থেকে আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলে দক্ষিণবঙ্গের ভূমি দ্রুত উত্তপ্ত হয়। এই সময় সূর্যের রশ্মি কর্কটক্রান্তি রেখা (Tropic of Cancer) ও কলকাতার মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রায় খাড়া (Near Vertical) অবস্থায় পড়ে। ফলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে ভূমিকে খুব দ্রুত গরম করে।
এই প্রবল উত্তাপের কারণে Convection বা উষ্ণ বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ অনেক বেশি শক্তিশালী ও ঘন ঘন তৈরি হয়। এর ফলে বজ্রগর্ভ কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ দ্রুত গড়ে ওঠে। ঠিক নিরক্ষীয় অঞ্চলের (Equatorial Region) মতো, যেখানে বিকেলবেলা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি খুবই সাধারণ ঘটনা, দক্ষিণবঙ্গেও এখন একই ধরনের আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য ক্রমশ বেশি করে দেখা যাচ্ছে।
এই কারণেই বর্ষার বিরতির সময় সকালে রোদ থাকলেও বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং কখনও শিলাবৃষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র হাওয়া ও স্থলভাগের শুষ্ক হাওয়ার সংঘর্ষ
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র সমুদ্রবায়ু কলকাতায় প্রবেশ করে। দিনের বেলায় এই আর্দ্র হাওয়ার সঙ্গে স্থলভাগের তুলনামূলক শুষ্ক ও উষ্ণ বাতাস মুখোমুখি হয়। এই Convergence বা বায়ুর সামনাসামনি হওয়া বায়ুমণ্ডলকে আরও অস্থির করে তোলে এবং বজ্রবিদ্যুৎ তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
উপরিস্তরের ঘূর্ণাবর্ত ও উইন্ড শিয়ারের প্রভাব
আবহবিদ আরও জানালেন, অনেক সময় উপরিস্তরে দুর্বল ঘূর্ণাবর্ত (Upper Air Cyclonic Circulation) বা ট্রফের উপস্থিতি থাকে। পাশাপাশি শক্তিশালী Vertical Wind Shear নিচের স্তরের আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে মাঝারি স্তরের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক বাতাসকে মিশিয়ে দেয়। এর ফলে বজ্রগর্ভ কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ ১৩ থেকে ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত উচ্চতায় পৌঁছে যায়। পরে এই মেঘ ভারী ও সম্পৃক্ত হয়ে গেলে শক্তিশালী Downdraft তৈরি হয়, যা প্রবল ঝোড়ো হাওয়া ও তীব্র বজ্রঝড়ের কারণ হতে পারে।
হুগলি নদী ও পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতা কেন বেশি সক্রিয়?
পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, কলকাতার অধিকাংশ বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হচ্ছে হুগলি নদী সংলগ্ন এলাকা এবং পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার উপর। এর অন্যতম কারণ, হুগলি নদী ও পূর্ব কলকাতার জলাভূমি (East Kolkata Wetlands) থেকে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প সরবরাহ হয়। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা বজ্রঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
এর ফলে কী কী হতে পারে?
আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কার মতে, এই ধরনের আবহাওয়ায় সাধারণত দেখা যেতে পারে—
- বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি।
- ঘন ঘন ক্লাউড-টু-গ্রাউন্ড (Cloud-to-Ground) বজ্রপাত।
- দ্রুত জলীয় বাষ্পীভবন ও আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন।
- শক্তিশালী ডাউনড্রাফ্ট, যার ফলে স্থানীয়ভাবে মাইক্রোবার্স্ট বা কখনও ক্লাউডবার্স্ট-সদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
- প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কেন সতর্ক থাকা জরুরি?
আবহবিদদের মতে, বর্ষার বিরতির সময় আকাশ পরিষ্কার থাকলেও বিকেলের দিকে দ্রুত আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। তাই বজ্রবিদ্যুতের পূর্বাভাস থাকলে খোলা জায়গা, জলাশয় এবং বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়াই নিরাপদ। এছাড়া সরকারি আবহাওয়া সংস্থার সতর্কবার্তার উপর নজর রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।























