MBFC vs JFC: তাঁর গোলেই টানা দ্বিতীয়বার আইএসএল ফাইনালে মোহনবাগান, গোড়ালিতে ব্যথা নিয়ে মাঠে নেমে নায়ক আপুইয়া
ISL 2024 25: প্রথম লেগে ২-১ পিছিয়ে থাকলেও, দ্বিতীয় লেগের ইনজুরি টাইমে আপুইয়ার অনবদ্য দূরপাল্লার গোলে ২-০ ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছয় মোহনবাগান।

কলকাতা: মাঝমাঠে তিনিই রাজা। তবে গোল করার খুব একটা প্রবণতা দেখা যায় না তাঁর পারফরম্যান্সে। চলতি আইএসএলে (ISL 2024 25) এর আগে ২০টি ম্যাচে মাঠে নেমে একটিতেও গোল পাননি। সারা আইএসএল কেরিয়ারে ১১২টি ম্যাচে মেরেকেটে আধ ডজন গোল করেছেন তিনি। আইএসএলে শেষ গোলটি করেছিলেন গত মরশুমে, মুম্বই সিটি এফসি-র হয়ে কেরল ব্লাস্টার্সের ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে নেমে।
ক্যালেন্ডারের হিসাব ধরলে সেই গোলের ঠিক দেড় বছর পর সোমবার রাতে আইএসএলে-র ম্যাচে গোল করতে দেখা গেল আপুইয়াকে (Apuia Ralte)। তাও এমন এক গোল, যে গোল চিরকাল মনে রাখবে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের সমর্থকেরা। ক্লাবের ইতিহাসেও হয়তো সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে এই গোলের বর্ণনা। কারণ, এই গোলই সবুজ-মেরুন বাহিনীকে টানা দ্বিতীয় মরশুমে ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে।
গোল করার বড় একটা অভ্যাস নেই। তাই নিজে গোল করে সেলিব্রেট করারও অভ্যাস নেই মিজোরামের এই ২৪ বছর বয়সি মাঝমাঠে নিবেদিত এই ফুটবলারের। সোমবারও অনিরুদ্ধ থাপার পাস থেকে অসাধারণ গোলটি করার পরও বুঝতে পারেননি, ঠিক কী ভাবে সেই আনন্দের উল্লাসে ফেটে পড়া উচিত।
নিজেই সে কথা শুনিয়ে আপুইয়া বলেন, “গোলটা করার পর আমার মাথা থেকে সব বেরিয়ে গিয়েছিল। বুঝতেই পারছিলাম না কী ভাবে সেলিব্রেট করব। আসলে অনেক দিন পরে গোল করলাম তো। যখন গোল করি, তখন আমার এ রকমই হয়। চেঁচাই আর সমর্থকেরা কতটা চেঁচাচ্ছে, কী করছে, সেটাই দেখি”।
তাঁর গোলের পর যখন যুবভারতীর গ্যালারিতে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কাছে মহানায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। তখন গ্যালারির ওই ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজছিলেন সদাহাস্য, সহজ, সরল পাহাড়ি ছেলেটি। কাকে খুঁজছিলেন, বান্ধবী বা প্রেমিকাকে?
উত্তরটা নিজেই দেন তিনি। বলেন, “গোলটা করার পর আমি আমার (তুতো) ভাই ফ্রেডিকে খুঁজছিলাম গ্যালারিতে। ও আমাকে বলেছিল, গোল করলে আমার গ্যালারির সামনে চলে আসবি, আমরা একসঙ্গে সেলিব্রেট করব। তাই আমি তখন গ্যালারিতে ওকে খুঁজছিলাম। কিন্তু এত লোকের মাঝখানে শেষ পর্যন্ত ওকে আর খুঁজে পাইনি। তাই সতীর্থদের সঙ্গেই সেলিব্রেট করি এবং ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই”।
দেড় বছর পর পাওয়া এই গোল সেই ভাইকেই উৎসর্গ করেন তিনি। বলেন, “এই গোলটা আমি আমার ভাই ফ্রেডিকেই উৎসর্গ করতে চাই। কলকাতায় এটাই আমার প্রথম বছর। নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে ও আমাকে খুব সাহায্য করেছে। ও-ই এই শহরে আমার একমাত্র ভাল বন্ধু। আমরা একসঙ্গেই থাকি। সারা মরশুমে আমার ভাল খেলার অন্যতম কারণও ও। ফ্রেডি না থাকলে আমাকে একা একাই থাকতে হত, যা আমার পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। ও আমাকে অনেক সাহায্য করে”। সেলিব্রিটিদের কাছ থেকে এমন সহজ, সরল স্বীকারোক্তি বড় একটা শোনা যায় না।
এই সরল স্বভাবের জন্যই বোধহয় সোমবার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে গোড়ালির ব্যথা নিয়েই নেমে পড়েছিলেন আপুইয়া। নিজের কথা একবারও ভাবেননি। চোটটা পেয়েছিলেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে খেলতে নেমে। নিজেই জানালেন সে কথা। বলেন, “বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে গিয়ে যখন চোট পাই, তখন খুব হতাশ হয়ে পড়ি। ভেবেছিলাম একটাও সেমিফাইনালে খেলতে পারব না। কিন্তু এমআরআই রিপোর্টে জানা যায় আমার গোড়ালির চোটটা অতটা গুরুতর নয়। দলের ফিজিও ও ডাক্তারদের সাহায্যে খুব ভাল রিহ্যাব করেছি। আজও গোড়ালিতে ব্যথা করছিল। এখনও একশো শতাংশ চোটমুক্ত নই আমি। যেহেতু মরশুমের একেবারে শেষ দিকে চলে এসেছি। তাই এই অবস্থাতেও মাঠে নামার জন্য নিজেকে উদ্দীপ্ত করি। দলের সঙ্গে অনেক দিন অনুশীলন না করা সত্ত্বেও কোচ আমার ওপর ভরসা রাখেন। দলকে এভাবে সাহায্য করতে পেরে আমি খুবই খুশি”।
তাঁর এই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত ও দলের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধেরই ফল একেবারে ম্যাচের শেষে পান আপুইয়া, যখন বক্সের বাঁদিক থেকে কাট ব্যাক করে বক্সের সামনে আপুইয়াকে গোলের শট প্রায় সাজিয়ে দেন অনিরুদ্ধ থাপা। গোলের প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে অসাধারণ ও মাপা শট হাওয়ায় গতিপথ বদলে বারের ঠিক নীচ দিয়ে জালে জড়িয়ে যায় এবং সমর্থকদের উল্লাসের বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। তাঁর যাবতীয় ব্যথা-যন্ত্রণা তখনই বোধহয় উধাও হয়ে যায়।
নিজেদের ওপর আস্থা রাখারই যে ফল পান, তা জানিয়ে আপুইয়া বলেন, “শেষ মুহূর্তে ও ভাবে গোল করার কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। ম্যাচের শুরু থেকেই আমরা গোল করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ মিনিটের আগে পর্যন্ত একটার বেশি গোল করা সম্ভব হয়নি। তবে নিজেদের ওপর আস্থা ছিল আমাদের, যে দ্বিতীয় গোলও আসবেই। একে অপরের ওপর ভরসা করি আমরা। সেই কারণেই এটা সম্ভব হল”।
সেমিফাইনালের প্রথম লেগে জামশেদপুরের কাছে ১-২ গোলে হেরেছিল সবুজ-মেরুন বাহিনী। সেই হারও ছিল হাভিয়ে হার্নান্ডেজের শেষ মুহূর্তের গোলে। ফলে ঘরের মাঠে দ্বিতীয় লেগ থেকে ফাইনালে উঠতে অন্তত দু’গোলের ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ছিল টানা দু’বারের শিল্ডজয়ীদের। প্রথমার্ধে জামশেদপুরের দুর্ভেদ্য ডিফেন্সে ফাটল ধরিয়ে যখন গোল পায়নি মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট, তখন বিরতিতে ড্রেসিংরুমে ফিরে গিয়ে একে অপরকে কী ভাবে ভরসা জোগান?
এর উত্তরে আপুইয়া বলেন, “জামশেদপুর যে আমাদের কাজটা কঠিন করে তুলবে, তা আমরা জানতামই। বিরতিতে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি, নিজেদের ওপর আস্থা বজায় রাখো। কারণ, আমরা জানতাম, নিজেদের ওপর আস্থা বজায় রাখলে গোল আসবেই”।
তবে এই গোলকে তাঁর কেরিয়ারের সেরা গোল বলছেন না। চার বছর আগের একটা গোল তাঁর এখনও মনে আছে। সেই গোলের কথা স্মরণ করে আপুইয়া বলেন, “নর্থইস্টের হয়ে যখন খেলতাম, তখন কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে একটা গোল করেছিলাম। সেই গোলটাই আমার সেরা গোল”। ২০২১-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমার্ধের সংযুক্ত সময়ে ডিলান ফক্সের পাস থেকে সেই গোলটি করে দলকে জিতিয়েছিলেন আপুইয়া। তার আগে ভিপি সুহেরও গোল করেছিলেন। সেই ম্যাচে ২-০-য় জয়ী হয় নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি।
তবে সোমবারের গোলকেও এই তালিকার ওপরের দিকেই রাখতে চান তিনি। বলেন, “এই গোলটা অবশ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই গোলটা করে দলকে ফাইনালে তুলতে পেরেছি। সে দিক থেকে, এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল বলতে পারেন। তবে সেরা নয়”।
ইন্ডিয়ান অ্যারোজ থেকে উঠে আসা এই তরুণ ফুটবলার নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-তে যোগ দেন ২০১৯-এর জুনে। সেখানে দু’বছর খেলে মুম্বই সিটি এফসি-তে যোগ দেন ২০২১-এর অগাস্টে। মুম্বইয়ের দলেও তিন বছর থাকার পর গত বছর জুনে যোগ দেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্টে।
আইএসএল ও অন্যান্য টুর্নামেন্ট মিলিয়ে নর্থইস্টের হয়ে ৩২টি, মুম্বই সিটি এফসি-র হয়ে ৮১টি ও মোহনবাগানের হয়ে আপাতত ২৬টি ম্যাচ খেলেছেন আপুইয়া। গত বছর মুম্বইয়ের সঙ্গে আইএসএল কাপ জেতেন। মুম্বই ও কলকাতার দলের হয়ে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২-এও খেলেছেন তিনি। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে দেশের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। ২০২১-এর মে থেকে প্রায় নিয়মিতই ভারতীয় দলে ডাক পান তিনি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে এ পর্যন্ত ১৮টি ম্যাচে খেলেছেন তিনি।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট দলের ও সমর্থকদের প্রশংসা করে আপুইয়া বলেন, “আমাদের দলের বেশিরভাগ ভারতীয় খেলোয়াড়ই জাতীয় দলের হয়ে খেলে। সে জন্যই আমাদের দলটা খুবই ভাল। আমাদের বিদেশীরাও যথেষ্ট উঁচু মানের ফুটবলার এবং লিগের অন্যতম সেরা। তবে সমর্থকদের অবদানের কথা বলতেই হবে। ওরা যা করেছে আমাদের জন্য, যে ভাবে প্রতি মুহূর্তে আমাদের জন্য গলা ফাটিয়েছে, তার কোনও তুলনা হয় না। আমাদের এই সাফল্য সমর্থকদের জন্যও”।
আগামী শনিবার ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হতে চলেছে বেঙ্গালুরু এফসি। গত বার শিল্ড জেতার পরেও নক আউট ফাইনালে মুম্বই সিটি এফসি-র কাছে হেরে গিয়েছিল সবুজ-মেরুন বাহিনী। সেই মুম্বই দলে ছিলেন আপুইয়া। এ বার ফের আইএসএলের ইতিহাসে জোড়া খেতাব জয়ের সুযোগ সবুজ-মেরুন বাহিনীর সামনে। সেই খেতাবী লড়াই নিয়ে আপুইয়া বলেন, “বেঙ্গালুরু দলটা একজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। ওদের পুরো দলটা খুব ভাল খেলে। ওদের কোচ ওদের খুব ভাল টেকনিক্যাল ফুটবলের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। গোলকিপার থেকে স্ট্রাইকার, প্রত্যেকেই ভাল খেলোয়াড়। তাই ম্যাচটা বেশ কঠিন হতে চলেছে। ফাইনাল ম্যাচ তো কঠিন হবেই। ওদের কাছেও ম্যাচটা কঠিন হবে। আমাদের সেরাটা দিতেই হবে”।
(তথ্য: আইএসএল মিডিয়া)






















