সমীরণ পাল, ময়ূখঠাকুর চক্রবর্তী, আবির দত্ত, কলকাতা : মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণের ঠিক তিন দিন আগে, প্রকাশ্য রাস্তায় গুলিতে ঝাঁঝরা করে খুন করা হয়েছিল তাঁর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে। সেই ঘটনায় চার দিনের মাথায় বড়সড় সাফল্য পেল তদন্তকারী দল। দুই ভিন্ন রাজ্য থেকে গ্রেফতার করা হল তিন অভিযুক্তকে। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অপরাধমূলক কার্যকলাপের রেকর্ড রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে ‘সুপারি কিলার’ ব্যবহার করেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
রবিবার গভীর রাতে রাজ্য পুলিশের SIT উত্তরপ্রদেশের বালিয়া থেকে গ্রেফতার করে শার্প শ্যুটার রাজ সিংকে। অন্যদিকে বিহারের বক্সার থেকে ধরা হয় আরও দুই অভিযুক্ত ময়ঙ্ক রাজ মিশ্র এবং ভিকি মৌর্যকে। তদন্তকারীদের দাবি, এই তিনজনই চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় সরাসরি যুক্ত। সোমবার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ধৃতদের বারাসাত আদালতে পেশ করা হয়। আদালত চত্বরে মোতায়েন ছিল RAF এবং বিশাল পুলিশ বাহিনী। রুদ্ধদ্বার শুনানির পর তিন অভিযুক্তকেই ১৩ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। আগামী ২৪ মে ফের তাদের আদালতে তোলা হবে।
বিশেষ সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় আদালতের বাইরে জানান, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিযুক্তদের আনা হয়েছে এবং গোটা তদন্ত অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “এখনই সব বলা সম্ভব নয়। তদন্ত আরও এগোলে বিস্তারিত বলা যাবে। আমরা তিনজনের পুলিশ হেফাজত চেয়েছিলাম, আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে।”
পুলিশ সূত্রে দাবি, চন্দ্রনাথ রথকে খুন করার জন্য ধৃত শার্প শ্যুটার রাজ সিংকে মোটা অঙ্কের সুপারি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্র আইনে তার বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। তদন্তে নেমে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, খুনের অপারেশন চালানোর আগে বিভিন্ন টোল প্লাজার বিল UPI ট্রানজাকশনের মাধ্যমে মেটানো হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, সেই টাকা গিয়েছিল ধৃত ময়ঙ্ক রাজ মিশ্রের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে। ফলে আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে খুনের নেপথ্যের মূলচক্রীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
ঘটনাটি ঘটে ৬ মে, বুধবার রাতে। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র দু’দিন পর মধ্যমগ্রামের রাস্তায় চন্দ্রনাথ রথের গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তদন্তকারীদের মতে, পুরো অপারেশনটি ছিল অত্যন্ত নিখুঁত এবং পরিকল্পিত। প্রথমে গাড়ির রাস্তা আটকে দেওয়া হয়। তারপর দুই দিক থেকে বাইকে এসে ঘিরে ধরে আততায়ীরা। মাত্র ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে একাধিক রাউন্ড গুলি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় তারা। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই হামলার মুহূর্ত এবং পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
আরও পড়ুন : প্রথমদিনই বিজেপি সরকার যে যে বড় সিদ্ধান্ত নিল, নবান্ন থেকে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
এই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খুনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, “তাকে মারা হয়েছে শুধুমাত্র বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর সহায়ক বলে, আর শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছে বলে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে।
তবে এখনও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। কেন খুন করা হল চন্দ্রনাথ রথকে? কারা এই সুপারি কিলারদের কাজে লাগাল? গোটা পরিকল্পনার নেপথ্যে কারা ছিল? তদন্তকারীদের দাবি, ধৃত তিন অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকি অভিযুক্ত এবং মূল ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে দেশজুড়ে অভিযান চালানো হবে।