Swastika Mukherjee: এক সময় নীলষষ্ঠীর উপোস রাখতে চাইতেন না, কোন ঘটনা বদলে দিল স্বস্তিকাকে?
Swastika Mukherjee News: আজ নীলষষ্ঠী। বিশেষ এই দিনটাতেও স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ভাগ করে নিলেন নিজের অনুভূতি

কলকাতা: সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ সক্রিয় তিনি হামেশাই তিনি ভাগ করে নেন বিভিন্ন ব্যক্তিগত অনুভূতি। তার মধ্যে বেশিরভাগটাই স্মৃতিচারণা। আজ নীলষষ্ঠী। বিশেষ এই দিনটাতেও স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় (Swastika Mukherjee) ভাগ করে নিলেন নিজের অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিতে এতটাই মায়া জড়ানো যে পড়তে পড়তে যেন মন ভাল হয়ে গেল নেটিজেনদের। এক মুহূর্তের জন্য তাঁরা যেন ফিরে গেলেন অল্প বয়সে। অথবা মা হওয়ার অনুভূতি যেন ফের একবার ঘিরে ধরল তাঁদের। নীলষষ্ঠীর উপোস রাখার গল্প বললেন স্বস্তিকা।
অভিনেত্রী স্মৃতির পাতা খুলে লিখছেন, 'কমলা মাসি আমাদের বাড়িতে ঠিকের কাজ করত। সে বহু বছর। আমি তখন স্কুলে পড়ি। পাড়ায় ছোট একটা ঘরে থাকত। স্বামী, ৩ মেয়ে, এক ছেলে নিয়ে সংসার। স্বামী চিরকাল অসুস্থ, খুব একটা কাজ করতে পারতেন না। মালো,মিনতি, টুম্পা আর রঞ্জন। আমার সঙ্গেই প্রায় সবাই বড় হলো, বলা ভাল আমরা একসঙ্গেই বড় হলাম - আর কমলা মাসি বুড়ি হল। ওরা কম বেশি পড়াশুনা করে সবাই বিয়ে থা করে নিল। মাসি দিল, ভাল ঘর দেখে। বাবা খাট আলমারি যা যৌতুক দিতে হবে সব কিনে দিল। এখনও মনে আছে মা গোদরেজ এর দোকানে গিয়েছিল আমাদের বাড়ির মতন আলমারি কিনতে।
রঞ্জন আরেকটু মন দিয়ে লেখাপড়া করে হসপিটালে চাকরি পেল। কমলা মাসি লোকের বাড়িতে কাজ করার থেকে বিরতি নিল। একদিন এসে আমার মা কে বলল - শোনো মা ছেলে বলছে আর কাজ না করতে। অন্য বাড়িগুলো তো আগেই ছেড়ে দিয়েছি, শরীর দেয় না। কলা বাগানের বাড়িটা আর তোমাদেরটা ছাড়তে পারি না, সেই কবে থেকে আছি। মা বলল, এ তো সুখবর কমলা, সেই কোন জন্ম থেকে ছেলে মেয়েগুলো কে একা হাতে মানুষ করলে, ছেলে বড় হয়েছে, তোমায় দেখবে, একদম কাজ ছেড়ে দাও। দুপুড়বেলা যেমন আমার কাছে খাও তেমনি এসো। তোমার খাবার তোলা থাকবে।
কমলা মাসি এবার হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসলো। মাসি এমনিও কথায় কথায় খুব কাঁদতো। আমার সঙ্গে একবার বিজলি প্রেক্ষাগৃহে আমারই একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। ছবির শেষে আমি মরলাম, ওদিকে চেয়ার থেকে কমলা মাসিও পড়ল। সে ডাক্তার বদ্দি ডেকে একাকার কাণ্ড।
এই বারে মাসি কাঁদতে কাঁদতে মা কে বলল - রঞ্জন পাকা বাড়ি নিচ্ছে গো মা, এই বস্তি তে আর থাকব না, পিয়ারলেস এর ওদিকটায় উঠে যাব। সারা জীবন একটা ঘরে থাকা এই মহিলা শেষে একটু নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা পাবে, নিজের একটা ঘর পাবে। এত বড় একটা আনন্দ কিন্তু বাড়িতে মা, কমলা মাসী, আমি সবাই কাঁদছি। মন শান্ত হতে এই স্থির হলো যে প্রতি রবিবার কমলা মাসি এসে আমাদের এখানে দুপুরে খাবে, বাবা বলল, তোমার মাইনে তুমি নিও কমলা, ছেলের কাছে সবকিছুর জন্য হাত পাততে হবে না। বাবা মারা যাওয়া অব্দি এই নিয়মই চলল। মাসি আসত, এখানে খেত বলে বেসিন এ দুটো বাসন পরে থাকলেও মেজে দিত, হাত পেতে এমনি এমনি টাকা নেবে ওই বিড়ম্বনায়। বারন করলে শুনত না তাই বাবা বলল থাক, ওটাই ওর অহংকার, ওটাকে খুন্ন করিসনা, যেটুকু ওর ইচ্ছে করতে দে।
এত কথা কেন বলছি ? কমলা মাসি প্রত্যেক বছর নীল ষষ্ঠীর আগেরদিন এসে বলত - বড়দি কাল কিন্তু নীল, উপোস করবে, তুমি না এখন মা, সন্তানের মঙ্গল কামনায় এটা করতেই হবে। আমি বলতাম, মা করছে তো। একটা ফ্যামিলি থেকে কত লোক ঠাকুর কে বলবে ? ঠাকুর বিরক্ত হয়ে যাবে মাসি। মাসি উত্তরে বলত, মা তো তোমাদের দুই বোনের টা করবে। আমি বলতাম, মা আমার ভাগেরটাও করে নেব, একই তো হলো, মানি আমার পেটে হয়েছে, আমরা মায়ের পেটে মানে পুরোটাই মায়ের পেটে, তাই মা করলেই হবে। আমার বোন মা হওয়ার পর কমলা মাসিকে ওকে কিছু বলতে হয়নি। বোন বিশাল ভক্ত - শিবের এবং পুজোর আচার বিচার নিয়ম কানুনের। ছেলের নামও শিব, ও এখনও সব ষষ্ঠী করে। উপোসের নাম করলেই আমার সেদিনই যত খিদে পেত। মা বলত থাক না কমলা ও পারেনা থাক না, সবাই কে কি সব পারতে হয়, আমি করে নিচ্ছি তো, একই হলো। ব্যাস, সমস্ত খিটখিট থেকে রেহাই।
মা চোখ বুঝল, কমলা মাসি আর কিছু না বলে নীলের দিন আমার ভাগের মানির উপোষটা রেখে দিত। বিকেলে হেসে বলত পুজো দিয়ে দিয়েছি বড়দি, মেয়ের মাথায় ফুলগুলো ছুঁয়ে দিও। মা চলে যেতে কবে একাদশী, অরন্ধন, কবে গোটা সেদ্ধ খেতে হবে, কবে শিবরাত্রি, অমাবশ্য, মাসি ফোন করে করে খবর দিত। সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায় - সময় হল, বাবাও চলে গেল। কোভিড এল, মাসির আসা বন্ধ হলো, মানি বিদেশ চলে গেল, আমি কাজের জন্য আকাশেই ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম, মাসির সঙ্গে ফোন এ যোগাযোগ কমতে কমতে বন্ধ হলো।
মাসির বড় মেয়ে মালো মাঝেমাঝে আসে, ওর কাছ থেকে খবর পাই। পাসের পাড়ায় ঠিকের কাজ ধরেছে। মালোর বর তেমন একটা কিছু করেনা, মালোই দুই মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করছে। বেশিদিন না এলে আমি মালোর বড়টাকে ফোন করে নিই। এখন আর আমার ভাগের উপোস করে, সন্তানের মঙ্গল কামনা করার লোক নেই। এখন আমিই উপোস করি। সকালে বোনকে ফোন করে পুজো দিতে কি কি নিয়ে যেতে হবে মিলিয়ে নিলাম, রান্নার পুতুলদি কে ফোন করে পাড়ায় কোন মন্দিরে যাব জিগ্গেস করলাম। রিকশা স্ট্যান্ডে একটা আছে, মাদার তলায় একটা আছে। যে কোনও একটাতে গেলেই তো হবে দিদি, পুতুলদি বলল, শিব তো শিবই।
পৃথিবীর সন্তানেরা থাকুক দুধে ভাতে - থাকুক আলোতে - মায়ের আঁচল আগলে রাখুক তাদের - নীল ষষ্ঠীর উপোস থাকুক আমাদের মায়েদের টাইমটেবিলে - আমাদের মানি, ফুলকি আর সাবিত্রীদের জন্য।'






















