বাউল, মেলা ও ফাগুন পূর্ণিমার রাত : ঘুরে আসি কল্যাণীর বিখ্যাত ঘোষপাড়ার সতীমায়ের মেলা থেকে
Kalyani Sati Maaer Mela : মন্ত্রপূত জল দ্রুত ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজনাবশে খানিকটা চলকে এক ডালিম গাছের গোড়ায় পড়ে। তার থেকেই ডালিমগাছটি হয়ে ওঠে কল্পতরু

কলকাতা : দোল পূর্ণিমায় আকাশজুড়ে রুপোর থালার মত পূর্ণচন্দ্র। চারদিক ভেসে যাচ্ছে ফাল্গুনী পূর্ণিমার আলোয়। মাতাল হাওয়ার সঙ্গে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বাউলের সুর। পুণ্যভূমির চারদিকে ছড়ানো ছিটানো আখড়া থেকে একতারার বোল ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে রসিক ক্ষেপার মন হারানো গান। এহেন পুণ্যভূমির সাক্ষী ঘোষপাড়ার সতীমার মেলা।
প্রতিবছর দোলের সময় বসে সতীমায়ের মেলা। নদীয়ার কল্যাণী শহরের মধ্যে ঘোষপাড়া বিখ্যাত হয়ে উঠেছে সতীমায়ের মেলার জন্য। বাংলার কর্তাভজা সম্প্রদায়ের গুরুমা সতীমার নাম অনুসারে প্রতিবছর ঘোষপাড়ায় সতী মায়ের মেলা বসে। মেলার বয়স প্রায় চারশো বছর।
মেলার মূল আকর্ষণ রাতে। দোল পূর্ণিমার রাতে মেলা জমজমাট হয়ে ওঠে বাউল গানের আখড়ায়। মেলা কর্তৃপক্ষের থেকেও তৈরি করা হয় মঞ্চ। ভিড়ে ঠাসা মঞ্চে একের পর এক গাইতে আসেন বিখ্যাত বাউল। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধুরা এই মেলায় ডেরা বাঁধেন। সেখানেও রাতে ধুনি জ্বালিয়ে জমে ওঠে বাউল গানের আসর। লেখক সমরেশ বসু কালকূট ছদ্মনামে বাউলের আখড়া ও এখানকার কাহিনী নিয়ে লিখেছেন তাঁর উপন্যাস “ কোথায় সে-জন আছে”।
বিভিন্ন আখড়ায় রাতের বেলা থেকেই শুরু হয় যজ্ঞ সহ নানা ধরনের উপাচার। ফাগুন পূর্ণিমার আলোয় সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাংলার গানের সুর। বাউল ছাড়া এখানে বসে কীর্তন, লোকগীতি, পল্লীগীতি। মেলায় গড়ে ওঠা আখড়ায় গাওয়া হয় নানা দেহতত্ত্বের গান, লালন ফকিরের গান সহ আরো নানা ধরনের বাংলার লোকগীতি।
ফিরে দেখা
কর্তাভজা ধর্মের উৎপত্তির পিছনে এক সুন্দর কাহিনী লুকিয়ে আছে। সেটা ছিল ইংরেজি ১৬৯৪ সাল। ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমার দিন, শুক্রবার। মহাদেব বারুই ছিলেন নদিয়ার বীরনগরের এক পানচাষি। দোল পূর্ণিমার দিন সকালে পান পাতা সংগ্রহ করতে তিনি পানের বরজের দরজা খুললেন। বৈষ্ণবভক্ত মহাদেব জয় গৌরনিতাই নাম নিতে নিতে পানের বরজের আলো-আঁধারি পথে এগিয়ে চলেন। একসময় হঠাৎ চমকে যান তিনি। বছর আটেকের এক সুদর্শন বালক বসে রয়েছে পানের বরজের ভেতর। কেন ও কীভাবে সে বদ্ধ পানের বরজের ভেতর এল, কিছুতেই বুঝতে পারেন না পানচাষি।
মহাদেব বালকটিকে কোলে করে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। নিজের ছেলের মতোই স্নেহে তাকে মানুষ করতে থাকেন। বালকটি কথা বলতে পারে কিন্তু তার আত্ম পরিচয় দিতে পারে না। পূর্ণিমার দিন তাকে পেয়েছিলেন বলে মহাদেব বালকের নাম রাখেন পূর্ণচন্দ্র।
পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে পূর্ণচন্দ্র এলেন নদীয়ার ফুলিয়ায়। বৈষ্ণব চূড়ামণি বলরাম দাস পূর্ণচন্দ্রকে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা দিলেন। পূর্ণচন্দ্রের নতুন নাম হল “আউলচাঁদ”।
আউলচাঁদকে তাঁর ভক্তরা চৈতন্যদেবের অবতার বলে মনে করতেন। চৈতন্যচরিতামৃত তাদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যে প্রধান ছিল। বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে কর্তাভজা ধর্মের যোগাযোগ কখনো ছিন্ন হয়নি। কিন্তু, কর্তাভজা সম্প্রদায় চিরকালই সাম্প্রদায়িকতা এড়িয়ে চলে। তাদের উপাস্যের নাম হয় “কর্তা”। কর্তার ভজন থেকে কর্তাভজা।
আউলচাঁদ কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। এদের প্রথম এবং প্রধান মন্ত্র “গুরুসত্য”। সেকালে কর্তাভজা দলকে বৈষ্ণবধর্মের একটা শাখা হিসেবেই ধরা হত।
আউলচাঁদের প্রধান ২২ জন শিষ্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে রামশরণ পাল আউলচাঁদের মৃত্যুর পর প্রধান গুরু হিসাবে নির্বাচিত হন। কল্যাণী ঘোষপাড়ার রামশরণ পাল সম্প্রদায় পরিচালনা করার দায়িত্ব তুলে নেন।
কীভাবে প্রধান শিষ্য হয়ে ওঠেন রামশরণ ? কথিত আছে, একদিন রামশরণ গরু দিয়ে মাঠে চরাতে গেলে এক ফকির সন্ন্যাসী তাঁর কাছে গরুর দুধ খেতে চান। রামশরণের দেওয়া দুধে পরিতৃপ্ত হয়ে সন্ন্যাসী তাঁর সঙ্গে বাড়িতে আসেন। এই সন্ন্যাসী ছিলেন আউলচাঁদ। সেই সময় একজন দৌড়ে এসে রামশরণের স্ত্রীর মুমূর্ষ অবস্থার কথা জানায়। সন্ন্যাসী রামশরণকে কাছের পুকুর থেকে জল ও মাটি আনতে বলেন। রামশরণ পুকুরের জল-মাটি আনলে সন্ন্যাসী তা মন্ত্রপূত করে তাঁর স্ত্রীর সর্বাঙ্গে লেপন করতে বলেন। মন্ত্রপূত জল দ্রুত ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজনাবশে খানিকটা চলকে এক ডালিম গাছের গোড়ায় পড়ে। তার থেকেই ডালিমগাছটি হয়ে ওঠে কল্পতরু। রামশরণের স্ত্রীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন ও দু’জনেই সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নেন।
রামশরণ পালের স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। কর্তাভজা সম্প্রদায়ের শিষ্যরা তাঁকে সতী মা বলে অভিহিত করেন। রামশরণের পর তাঁর স্ত্রী কর্তাভজা ধর্মের গুরু মা হন।
সতী মায়ের মেলা হিন্দু-মুসলমানের মেলা। অনেকে আবার বাইশ ফকিরের মেলাও বলেন। শোনা যায় স্বয়ং লালন ফকির আসতেন এই মেলায়। সেই রীতি মেনে এখনও মেলায় উপস্থিত হন বাংলার বিভিন্ন ধরনের সাধক ও পন্থীরা। নাথপন্থী, অঘোর ও যোগপন্থী শক্তিসাধন, দশনামী সন্ন্যাসী, আউল বাউল এবং অন্যান্য বহু সম্প্রদায়ের আখড়া জমে ওঠে দোল পূর্ণিমা রাতে।
১৮৯৩ সালে আমেরিকার যে শিকাগো ধর্ম সভায় বক্তব্য রাখেন স্বামী বিবেকানন্দ, তার অ্যাডভাইজ়রি কাউন্সিলে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন। স্থাপিত হওয়ার এক শতকের মধ্যেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় এই সম্প্রদায়।
মেলায় যাই
মেলার দোকানপাট, ভিড় সামলে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে শ্বেত পাথরের সতীমার মূর্তি। তার পাশেই বহু প্রাচীন সতীমার বাড়িটি কর্তাভজা সম্প্রদায়ের উপাসনা স্থল ও তাদের ঠাকুরবাড়ি। বাড়ির ভেতর খোলা উঠোনের মধ্যে শান-বাঁধানো একটি ডালিম গাছ। কথিত যে, এই গাছের গোড়াতেই পড়েছিল মন্ত্রপূত জল। তাতে এ গাছ হয়ে উঠেছে কল্পতরু, মনস্কামনা পূরণের মাধ্যম। যার যা মনস্কামনা, তা পূরণ করতে এই গাছের ডালে ঢিল বেঁধে মানত করার রেওয়াজ। এখন পোড়ামাটির ছোট ঘোড়া কিনতে পাওয়া যায় মানত করে গাছে ঢিল বাঁধার জন্য। ডালিম গাছকে কেন্দ্র করে চলে পুজো। পুজোর উপাদান খুব সামান্য। মাটির সরার মধ্যে খই বাতাসা ফুল সিঁদুরের প্যাকেট সেইসঙ্গে ধূপকাঠি। এই হল পূজার উপকরণ। ডালিম গাছের তলায় বসে পুরোহিতের হাতে পুজোর জন্য দিলেই তারা গাছে ছুঁইয়ে ফেরত দেয় ভক্তদের হাতে। ডালিম গাছ ছাড়িয়ে একটু এগোলেই দেখা যাবে
কীভাবে যাবেন
ঘোষপাড়ার সতীমায়ের মেলায় যাওয়া যায় খুব সহজে। শিয়ালদা থেকে কল্যাণী সীমান্ত লোকাল ধরে নামতে হবে কল্যাণী ঘোষপাড়া স্টেশনে। এছাড়া, কল্যাণী মেন স্টেশন থেকে প্রচুর বাস, অটো, টোটো পাওয়া যায় ঘোষপাড়া আসার জন্য।
ঘোষপাড়া স্টেশন থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে সোজা মিনিট দশেক চললেই পৌঁছে যাওয়া যাবে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সতীমায়ের বাড়ি। মেলা চলাকালে দেখা যায় রাস্তা দিয়ে চলেছে জনস্রোত। প্রত্যেকেরই গন্তব্য সতীমায়ের মেলা।
সড়ক পথে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বুদ্ধপার্ক মোড় থেকে ঘুরে আইটিআই মোড় হয়ে সোজা গেলেই ঘোষপাড়া। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশেই।
থাকার জায়গা
কল্যাণীতে বিভিন্নমানের হোটেল, লজ আছে। সেন্ট্রাল পার্কের আশপাশে।
মেলার সময়
দোল পূর্ণিমা রাতে মেলার মূল আকর্ষণ। মেলা চলে দোলের আগের দিন থেকে পরবর্তী সাত দিন, সর্বদা। দিনের বেলা পুজো মানতপর্ব আর রাতে আখড়ার গান। বিকেল থেকে জমজমাট হয়ে ওঠে মেলা।
ছবি : লেখক
তথ্য ঋণ :
১. কর্তাভজার কথা ও গান - সুকুমার সেন, বিশ্বভারতী পত্রিকা, দশম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা
২. “কর্তাভজা ধর্মের ইতিবৃত্ত” - দেবেন্দ্রনাথ দে
৩. মেলায় মেলায় আমার দেশ - ভবেশ দত্ত
৪. কল্যাণী সেকাল ও একাল - নিতাই ঘোষ
৫. নদীয়া কাহিনী - কুমুদনাথ মল্লিক






















