Daniel Kahneman Death: শেষ জীবনে দুর্দশা-অসম্মান চাননি, গোপনে নিষ্কৃতি-মৃত্যু বেছে নেন নোবেলজয়ী! সামনে এল শেষ চিঠি
Nobel Prize Winner Assisted Death: ইজরায়েলি-আমেরিকান মনোবিদ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড্যানিয়েল কানেমান ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ মারা যান।

নয়াদিল্লি: বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তাই বার্ধক্যজনিত কারণ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু নোবেলজয়ী ড্যানিয়েল কানেমানের মৃত্যু নিয়ে এবার জলঘোলা শুরু হল। একবছর আগেই প্রয়াত হন ড্যানিয়েল। এতদিন পর তাঁর মৃত্যুর কারণ খোলসা হল। জানা গেল, বার্ধক্য়জনিত কারণ বা অসুস্থতার জেরে নয়, নিজেই নিষ্কৃতি-মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আর এই তথ্য সামনে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নিষ্কৃতিৃ-মৃত্যুর বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। (Daniel Kahneman Death)
ইজরায়েলি-আমেরিকান মনোবিদ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড্যানিয়েল কানেমান ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ মারা যান। সেই সময় তাঁর মৃত্যু নিয়ে কাটাছেঁড়ার কোনও কারণই সামনে আসেনি। কিন্তু সম্প্রতি Wall Street Journal-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ড্যানিয়েলের মৃত্যুর আসল কারণ সামনে আসে। প্রতিবেদনের লেখক জেসন জুয়েগ জানান, ৯০তম জন্মদিনের তিন সপ্তাহ পর নিষ্কৃতি-মৃত্যু বেছে নেন ড্যানিয়েল। আমেরিকার সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করে সুইৎজারল্যান্ডের একটি সংস্থা। (Nobel Prize Winner Assisted Death)
নিষ্কৃতি-মৃত্যু নিয়ে এশিয়ার দেশগুলিতে এখনও ততটা চর্চা হয় না, যতটা পশ্চিমের দেশগুলিতে হয়। ইংরেজিতে একে বলে Assisted Suicide, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় যদি নিজেকে শেষ করে দিতে চান কেউ, সেই কাজে তাঁকে সহযোগিতা করা। পৃথিবীর কিছু দেশে এই নিষ্কৃতি-মৃত্যু আইনত বৈধ। সুইৎজারল্যান্ডেও এটি বৈধ, যেখানে চিকিৎসকরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দেন। তবে কাদের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবদন গৃহীত হবে, কাদের হবে না, তার ভিন্ন ভিন্ন মাপকাঠিও রয়েছে। কানাডা, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লাক্সেমবার্গ, কলম্বিয়া, স্পেন, নিউজিল্যান্ড, পর্তুগাল, ইকুয়েডরের মতো দেশের নিজস্ব বিধান রয়েছে এ নিয়ে।
ড্যানিয়েলের একটি ইমেলও সামনে এসেছে, যেখানে তিনি লিখে গিয়েছেন, 'জীবনের শেষ বছরগুলি দুর্দশা এবং অসম্মানের কোনও প্রয়োজন নেই বলে কিশোর বয়স থেকেই বিশ্বাস করে আসছি আমি'। জানা গিয়েছে নিষ্কৃতি-মৃত্যু বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গোপনই রেখেছিলেন ড্যানিয়েল। পরিবার এবং বন্ধুদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে শুধু জানিয়েছিলেন। ২৬ মার্চই শেষ চিঠি হিসেবে ঘনিষ্ঠদের ওই ইমেলটি পাঠান তিনি। Wall Street Journal-এ জেসন লিখেছেন, 'আমার মনে হয়, নিজের শর্তেই পৃথিবী ছাড়তে চেয়েছিলেন ড্যানি। নিজে নিজের মৃত্যুর মালিক হতে চেয়েছিলেন'। তবে ড্যানিয়েলের পরিবার এবং ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, তিনি নিজে নিষ্কৃতি-মৃত্যু বেছে নিলেও, অন্য কেউ সেই পথে হাঁটুন তা কখনও চাননি, কোনও ভাবে নিষ্কৃতি-মৃত্যুর প্রচার করেননি।
ড্যানিয়েলের লেখা যে চিঠি তুলে ধরেছে Wall Street Journal, তাতে লেখা রয়েছে, 'জীবনের শেষ বছরগুলি দুর্দশা এবং অসম্মানের কোনও প্রয়োজন নেই বলে কিশোর বয়স থেকেই বিশ্বাস করে আসছি আমি, এবং সেই বিশ্বাসে ভর করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমি এখনও সক্রিয়, জীবনের অনেক কিছুই উপভোগ করছি (দৈনন্দিন সংবাদ ছাড়া) এবং সুখী মানুষ হিসেবেই হয়ত মারা যাব। কিন্তু আমার কিডনির কার্যকারিতা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঘন ঘন মানসিক স্খলন ঘটছে এবং আমার বয়স নব্বই হয়ে গিয়েছে। এটাই যাওয়ার সময়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বুঝলাম, অস্তিত্ব না থাকার ভয় পাই না আমি। আমার কাছে মৃত্যু হল এমন ঘুম, যা ভাঙে না। শেষ সময়ে তেমন কোনও কষ্ট হয়নি, তবে আমার জন্য অন্যকে কষ্ট পেতে দেখেছি। তাই আমার জন্য কষ্ট পাবেন না। বরং আমার জীবনকে সুখের করে তোলার জন্য ধন্যবাদ আপনাকেও'।
ড্যানিয়েলের মৃত্যু নিয়ে এই তথ্য সামনে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। কারণ আজীবন মানুষের ভাবনা-চিন্তা নিয়েই কাজ করে গিয়েছেন তিনি। অনশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষ কী ভাবে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হন, নিজের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করেই এগিয়েছেন, যা তাঁর শেষ চিঠি থেকেই বোঝা যাচ্ছে। মানুষের আচরণ নিয়ে যাঁদের গবেষণা, নিজের মৃত্যুতেও তাঁদের জন্য ড্যানিয়েল অনেক কিছু রেখে গেলেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ড্যানিয়েলের নিজের লেখালেখিতে বার বার দেখিয়েছেন, সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ পক্ষপাতমূলক ধারণাকে কতটা গুরুত্ব দেন। কিছু হারানোর ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিক্রিয়া হয় বাড়াবাড়ি রকমের, অন্যের সঙ্গে তেমন ফারাক থাকে না, নিজের উপর আস্থা একটু বেশিই। একই সঙ্গে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে কোথাও যেন বাকিদের চেয়ে আলাদা থেকে গেলেন ড্যানিয়েল। পক্ষপাতমূলক ধারণাগুলিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি, উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়ার মনোবিদ এবং ড্যানিয়েলের বন্ধু ফিলিপ টেটলক বলেন, "শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের সকলের চেয়ে বহু গুণ স্মার্ট ছিলেন ড্যানিয়েল। আমি মন পড়তে পারি না। তবে মনে হয়, ও হয়ত ভেঙে পড়ছিল, শারীরিক ভাবে এবং জ্ঞানের দিক থেকেও। আমার মনে হয়, জীবনের সুফল কখন জীবনের বোঝা হয়ে ওঠে, হিসেব কষে তা হয়ত বের করে ফেলেছিলেন উনি। নব্বইয়ে পৌঁছে শেষের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন হয়ত। এর চেয়ে সুপরিকল্পিত মৃত্যু আগে দেখিনি আমি।"
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে ড্য়ানিয়েলের প্রাক্তন সহকর্মী এল্ডার শরিফ জানান, নিজক্ষেত্রে অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ড্যানিয়েল। ড্যানিয়েল আসার পর সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রই পাল্টে যায়। ওঁর অভাব সকলে অনুভব করবেন। ড্যানিয়েলের লেখা 'Thinking, Fast and Slow' সব মহলেই সমাদৃত। লাভের পিছনে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে কী করে ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়ানো যায়, তার উপর জোর দিতেন ড্যানিয়েল। নিজের গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, কিছু লাভ করে আমরা যতটা না খুশি হই, কিছু হারিয়ে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি যন্ত্রণা অনুভব করি। তাই কোথায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া যায়, কোথায় সংযত থাকা উচিত, তা বিশদে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতেও ভাবনার নতুন পরিসর দেখতে পাচ্ছেন মনোবিদরা।
তথ্যসূত্র: Wall Street Journal






















