What's Happening in Iran: ইরানে পোড়ানো হল আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের ছবি, বিক্ষোভে উত্তাল গোটা দেশ, বাড়ছে হতাহত, হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্পও
Iran Protests: এই মুহূর্তে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট ইরানে।

নয়াদিল্লি: যুদ্ধ ঘনিয়ে এসেছিল গতবছর। ঘরে-বাইরে বিপুল চাপ তৈরি হয়েছিল। নতুন বছরেও সেই অবস্থা কাটল না। বরং এই মুহূর্তে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের উপর দমন-পীড়ন শেষ না হলে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে। আর তাতেই ফের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি তেতে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকরা। (Iran Protests)
এই মুহূর্তে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট ইরানে। আমেরিকার ডলারের তুলনায় তাদের মুদ্রা রিয়াল একেবারে ধুঁকছে। পাশাপাশি, মুদ্রাস্ফীতিও চরমে। ফলে দৈনিক জীবনযাপনের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এর বিরুদ্ধেই গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিবাদ-আন্দোলন চলছে সেখানে। সেই প্রতিবাদ ঠেকাতে নামানো হয় সেনা। আর তাতেই পরিস্থিতি চরমে উঠেছে। নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক জন প্রাণ হারিয়েছেন। (What's Happening in Iran)
অর্থনৈতিক সঙ্কট, মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে গত রবিবার প্রথমে সাধারণ দোকানদাররা ব্যবসা বন্ধ রেখে প্রতিবাদে শামিল হন। এর পর ধাপে ধাপে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আঁচ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত সাত জন প্রাণ হারিয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৪ জনকে। তবে বিক্ষোভ থামানো যায়নি। দেশের ৩১টি প্রদেশের ১৯টির পরিস্থিতি উত্তাল। বর্ষবরণে আন্দোলনে যোগ দেন ছাত্ররাও। বিক্ষোভকারীদের হটাতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে নিরাপত্তাবাহিনী।
Message from Iran:
— Masih Alinejad 🏳️ (@AlinejadMasih) January 2, 2026
This is Marvdasht. People are in the streets. The Islamic Republic is brutally cracking down.
With every young person the Islamic Republic kills, our anger grows stronger.
We must win, otherwise Khamenei will slaughter us all and hang us.
Let the world hear our… pic.twitter.com/7zEAPKNAst
বৃহস্পতিবারই দক্ষিণ-পশ্চিমের লর্দেগানে সংঘর্ষে তিন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। আজনায় মারা গিয়েছেন আরও তিন জন। এক জন মারা গিয়েছেন কুদাশতে। দেশের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রশাসনিক ভবন লক্ষ্য করে ইঁট-পাথর ছুড়তে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। মসজিদ, শহিদ স্মৃতি সৌধ, টাউন হল, ব্যাঙ্কেও পাথর ছোড়া হয়। প্রথমে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ। সেই থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু ভিডিও-ও সামনে এসেছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাসক আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধেও স্লোগান শোনা যায় যে, 'মোল্লাদের ইরান ছাড়তে হবে', 'মোল্লারা যতদিন থাকবে, মাতৃভূমি স্বাধীন হবে না'। এমনকি একটি ভিডিও-তে খামেনেই-এর পোস্চার পোড়াতেও দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বুধবার ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক নতুন গভর্নর নিযুক্ত করে। দায়িত্ব হাতে পেয়েই আবদুলনাসের হেম্মাতি জানান, দেশে অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর তিনি। কিন্তু তাতেও পিছু হটছেন না আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার দেশের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রক ইউনিভার্সিটি অফ তেহরান এবং আরও দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিওরিটি ম্যানেজারকে অপসারণ করে। শিক্ষাঙ্গনে আন্দোলন রুখতে না পারাতেই তাঁদের শাস্তি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
সেই অবস্থায় বৃহস্পতিবার ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের প্রাক্তন সিনিয়র কমান্ডার কাসেম সোলেইমনির স্মরণসভায় বক্তৃতা করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনার আবেদন জানান তিনি। অর্থনৈতিক সংশোধনের পাশাপাশি, দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতিও দেন। বলেন, “ভাড়ার নামে যে তোলাবাজি, পাচার, ঘুষ চলছে, তা রুখতে বদ্ধপরিকর আমরা। এই সময় আমাদের একজোট হতে হবে। এক সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে পরিস্থিতির। শোষিত, প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে।” পাশাপাশি, বর্তমানে যে ভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তার নেপথ্যে শত্রুপক্ষের ইন্ধন রয়েছে বলেও দাবি করেন পেজেশকিয়ান।
History is being made in Iran. pic.twitter.com/gIl2K0CtvF
— Melissa Francis (@MelissaAFrancis) January 1, 2026
যদিও মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজছে না। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, রবিবার আমেরিকার ডলারের সাপেক্ষে ইরানের রিয়াল একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে, ১.৪২ মিলিয়ন। গত ছ’মাসে রিয়ালের দামে ৫৬ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। এর ফলে গত বছরের তুলনায়, ইরানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামে ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি চোখে পড়ছে। ইরানের এক ট্যাক্সি চালক, মজিদ ইব্রাহিমি Al Jazeera-কে বলেন, “শুধুমাত্র জ্বালানির উপর জোর না দিয়ে, সরকারি যদি জিনিসপত্ররে দাম কমানোয় উদ্যোগী হতো…দুগ্ধপণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় ছ’গুণ বেড়ে গিয়েছে। কিছু জিনিসের দাম বেড়েছে ১০ গুণ।”
পৃথিবীর অন্য সব দেশের তুলনায় ইরানের উপরই সর্বাধিক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। আমেরিকা এবং পশ্চিমের দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার জেরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তারা। পাশাপাশি, বিদেশে তাদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত হয়ে গিয়েছে। আমদানির উপর নির্ভর করেই দেশ চলছে। ফলেক খরচ বাড়লেও, সেই তুলনায় আয় নেই। এর জন্যও ট্রাম্প সরকারের নীতিকে দায়ী করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাদের হাশেমি বলেন, "আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে, ইরানের উপরই এযাবৎকালীন সবচেয়ে কঠোর ও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। আমেরিকার বিদেশনীতির সামনে মাথা না নোয়ালে মুক্তি পাওয়ার উপায় নেই।" মিডস ইস্ট ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স ভটাঙ্কা বলেন, "ট্রাম্পের কঠোর নীতি ইরানকে কোণঠাসা করে দিয়েছে। দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে চরমে। কূটনৈতিক সমাধানের আশাও আর নেই প্রায়। আর তাতেই বিক্ষোভ আরও সার্বিক আকার ধারণ করেছে।"
এই পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছেন ট্রাম্পও। তাঁর বক্তব্য, “শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের যদি হিংস্র ভাবে হত্যা করে ইরান, যা ওদের রীতি, তাহলে আমেরিকাকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। আমরা কিন্তু প্রস্তুত আছি।” এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ট্রাম্প ‘আগুন নিয়ে খেলছেন’, ‘বেপরোয়া আচরণ করছেন’ বলে দাবি করেন তিনি।
They are burning images of Khamenei
— John Aziz (@aziz0nomics) January 2, 2026
Godspeed Iran! pic.twitter.com/w2s0Kb8ltm
গত কয়েক বছরে এই নিয়ে একাধিক বার উত্তপ্ত হয়ে উঠল ইরান। ২০২২ সালে ঠিক মতো হিজাব না পরায় ২২ বছর বয়সি মাহসা আমিনিকে হত্যার অভিযোগ ওঠে সেদেশের ‘নীতি পুলিশে’র বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার প্রতিবাদে ২০২২ সালে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা ইরান। মাহসার শেষকৃত্য থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। প্রকাশ্যে হিজাব খুলে পুড়িয়ে দেন মেয়েরা। চুল কেটেও প্রতিবাদ জানান অনেকে। সেই সময় হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। শত শত মানুষকে বেআইনি ভাবে হত্যা করা হয় বলেও ওঠে অভিযোগ। ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি রিপোর্টে বলা হয়, ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’ ঘটিয়েছে ইরান। এমনকি গতবছর ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত যখন চরমে, সেই সময়ও দেশে প্রতিবাদ-আন্দোলন চলছিল।
BURN TO HELL @Khamenei_fa !! We are coming after you !! ⏳ pic.twitter.com/6OvWouIIl3
— Association Femme Azadi (@femmeazadi) January 3, 2026
এবারেও ইরানের নাগরিক আন্দোলন বড় আকার ধারণ করতে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও তার প্রভাব পড়তে চলেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। কারণ ট্রাম্প যেমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তেমনই ইজরায়েলও ইরানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। গত জুন মাসেই ইরানের সঙ্গে ১২ দিন ব্যাপী যুদ্ধ চলে ইজরায়েলের। সেই সময় ইরানে হামলা চালায় ইজরায়েল এবং আমেরিকাও। আমেরিকার Axios ওয়েবসাইটের দাবি, নতুন করে ফের ইরানকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের মধ্যে। ইরানের উপর পুনরায় হামলা চালানোর পাশাপাশি, ইরানের শরিক, লেবাননের হেজবোল্লাকে লক্ষ্য় করে হামলা চালানোর কথাও হচ্ছে। এর পাল্টা পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, নিষ্ঠুর আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে বদ্ধপরিকর ইরান, যাতে পুনরায় মাথা তুলতে না পারে তারা। শেষ পর্যন্ত জল কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে সকলে।






















