Asish Banerjee Death: অধ্যাপনা থেকে রাজনীতিতে এসেছিলেন ‘মাস্টারমশাই’, গায়ে কালি লাগাই কি মেনে নিতে পারলেন না? আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্যমৃত্যু
Asish Banerjee: অধ্যাপনা থেকে রাজনীতিতে এসেছিলেন। রহস্যমৃত্যু আশিস বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের। তৃণমূলের পার্টি অফিস থেকে দেহ উদ্ধার।

রামপুরহাট: রামপুরহাটের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্যমৃত্যু। বাড়ি লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হল। রামপুরহাটের পাঁচ বারের বিধায়ক তিনি। তৃণমূল আমলে বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার পদেও আসীন হন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন আশিস। রাজ্যে পালাবদলের পর জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্য়ানের পদ ছেড়ে দেন। তাঁর রহস্যমৃত্যুতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। উদ্ধার হয়েছে একটি নোটও, যা সুইসাইড নোট বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুর খবরে স্তম্ভিত অনুরাগী থেকে রাজনীতিকরা। শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকায়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত 'মাস্টারমশাই' হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। (Asish Banerjee)
বীরভূমের ভূমিপুত্র আশিস। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। PhD-ও সম্পূর্ণ করে সেখানেই। ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তীতে অধ্যাপনায় প্রবেশ। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ রামপুরহাট কলেজে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে কাজে যোগ দেন আশিস। পাশাপাশি, রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ গাঢ় হয়। (Asish Banerjee Death)
বীরভূম সেই সময় লাল-গড়। রাজ্য রাজনীতিতে বামেদের একচ্ছত্র আধিপত্য। সেই সময়, ২০০১ সালে রামপুরহাট বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হন আশিস। সেই প্রথমবার রামপুরহাটের বিধায়ক হন তিনি। এর পর ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও রামপুরহাট থেকে পুনর্নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে রাজ্য মন্ত্রিসভায় জায়গা পান আশিস। আয়ুর্বেদ, যোগ ও প্রাকৃতিক চিকিৎসা, ইউনানি, সিদ্ধ এবং হোমিওপ্যাথি বিভাগের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন। পরের বছর আবার বায়োটেকনোলজি, পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্ব হাতে পান তিনি।
২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হন আশিস। ২০২১ সালের ২ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৭ মে পর্যন্ত বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার ছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও রামপুরহাট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আশিস। নিজের জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, নিজের কাজকে সামনে রেখেই ভোটের প্রচারে নামেন। রামপুরহাটের মানুষের উপর পূর্ণ আস্থা ছিল তাঁর। কিন্তু ফল বেরোতে দেখা যায়, বিজেপি-র ধ্রুব সাহা জয়ী হয়েছেন। পরাজিত হয়েছেন আশিস।
অনুব্রত মণ্ডল বীরভূমে তৃণমূলের জেলা সভাপতি থাকাকালীন, তাঁর সঙ্গী ছিলেন আশিস। সেই সময় তেমন প্রভাব না থাকলেও, অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পর বীরভূমে তৃণমূলের সংগঠন সামলান আশিসই। ২০২৬ সালেও তাঁকে টিকিট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ান আশিস। জুন মাসে জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দেন তিনি। বীরভূমে তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্যপদও ছাড়েন। জুলাই মাসে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তাঁর ঠিক পর পরই ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন অনুব্রত। তবে আশিস রাজনীতিতে আর সেভাবে সক্রিয় ছিলেন না।
রাজনীতিতে যোগ দিলেও, অধ্যাপক হিসেবে সর্বত্র সম্মান পেতেন আশিস। অধ্যাপক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম ছিল তাঁর। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীরাই নন, সাধারণ মানুষ থেকে দলীয় কর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন 'মাস্টারমশাই'। মিটিং-মিছিল, প্রচারে গেলে সকলেই 'স্যর' বলে এগিয়ে যেতেন। বীরভূমের ভূমিপুত্র হিসেবে সাধারণ মানুষ তাঁর কাছে ছুটে যেতেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। তিনি চেষ্টাও করতেন যথাসাধ্য সাহায্যের।
বরাবর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ছিল আশিসের। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে বিজেপি। তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদ থেকে রাজ্য সরকারের কোটি কোটি টাকা নিয়ে তছরুপ হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। সেই নিয়ে তদন্ত শুরু হয় যেমন, রামপুরহাট পুরসভা নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, গায়ে কালি ছিটনো মেনে নিতে পারেননি আশিস। মনে মনে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। মানসিক ভাবে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
শনিবার রাতেও পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন আশিস। অনেক দিন পর ফেসবুকে একটি ছবিও আপলোড করেন। রবিবার সকালে বাড়ি লাগোয়া তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে, যাতে লেখা রয়েছে, তিনি কোনও দুর্নীতি করেননি। কখনও কারও থেকে টাকা নেননি, টাকার বিনিময়ে কাউকে কিছু করেও দেননি কখনও। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। শুধু তাই নয়, পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে লেখা রয়েছে, কেউ যেন রাজনীতিতে না আসেন। তাঁর রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
দলীয় কর্মীরা জানিয়েছেন, যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে তাঁকে নিয়ে, যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা মেনে নিতে পারছিলেন না আশিস। মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। অনুব্রত জানিয়েছেন, আশিস এত ভাল মানুষ ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কারও শত্রুতা থাকার কথাই নয়। বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব কোনও বিতর্কে যাননি। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনে জেতার পর প্রণাম করতে গিয়েছিলেন। এমন কিছু ঘটতে পারে বলে ইঙ্গিতই পাননি তখন। দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, "দুর্নীতির তদন্তে ওঁর নাম আসবে কি না আসবে, সেটা তো পরের ব্যাপার। কিন্তু এই যে ঘটনা ঘটেছে, অত্যন্ত মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক। নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।"























