এক্সপ্লোর
পুজোয় ঘুরে আসি : ধান্যকুড়িয়া রাজবাড়ির পুজো
...সুবিশাল রাজবাড়ির সিংহ দুয়ার পেরিয়ে প্রবেশ করতেই বেজে উঠল সমবেত ঢাক। প্রকান্ড দুর্গামণ্ডপে শুরু হচ্ছে দেবীর বোধন। একই সঙ্গে সাহেব বরণ। ঘুরে আসুন ধান্যকুড়িয়া থেকে।

কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, জানতে পড়ুন
Source : Author
কলকাতা : সে প্রায় সোয়াশো বছর আগের কথা। এমনই এক শরৎকালের দুপুর বেলা। চারদিক রোদ ঝলমলে, বাতাসে শীতের আমেজ। দূরে নীল আকাশ আর সবুজ ধানের খেত যেখানে দিগন্তে মিলেছে সেখানে দেখা গেল রেল ইঞ্জিন। কুচকুচে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে আসছে শ্যামবাজার-হাসনাবাদ মার্টিন রেল। গায়েন গার্ডেন নামে স্টেশনে এসে থামলো ন্যারো গেজের ছোট্ট বাষ্পচালিত ট্রেন। মাত্র ছয় কামরার এই ট্রেন লোকের মুখে মুখে মার্টিন গাড়ি বা ছোটগাড়ি বলে পরিচিত। যে বছরটা বাঙালির কাছে কুখ্যাত হয়ে আছে বঙ্গভঙ্গের জন্য, সেই ১৯০৫ সালে খুলে দেওয়া হয় শ্যামবাজার-হাসনাবাদ মার্টিন রেল। ছাড়ত বেলগাছিয়ায় এখন যেখানে ট্রাম ডিপো সেখান থেকে। যদিও স্টেশনের নাম ছিল শ্যামবাজার। এরপর পাতিপুকুর , কেষ্টপুর, বাগুইআটি , রাজারহাট, লাঙ্গলপোতা , বেলিঘাটা হয়ে চলে যেত বসিরহাটের দিকে।
মার্টিন রেল থামতেই স্টেশনে উপস্থিত জমিদারের নির্দেশে বেজে উঠল গ্রাম্য ব্যান্ডপার্টি। ট্রেন থেকে নামলেন একদল ইংরেজ সাহেব। দীর্ঘক্ষণ রেল যাত্রায় বেশ ক্লান্ত ও নেশাগ্রস্ত। রেল পথে আসার সময় পানাহারটা একটু বেশিই হয়েছে। আর হবেই বা না কেন, ছুটিতে চুটিয়ে ফূর্তি করতেই তো আসা এখানে। শশব্যস্ত জমিদার, সাহেবদের গলায় গাঁদাফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়ে চললেন বাড়ির দিকে। সামান্য পথ, সাহেবদল চললেন টলতে টলতে।
সুবিশাল রাজবাড়ির সিংহ দুয়ার পেরিয়ে প্রবেশ করতেই বেজে উঠল সমবেত ঢাক। প্রকান্ড দুর্গামণ্ডপে শুরু হচ্ছে দেবীর বোধন। একই সঙ্গে সাহেব বরণ।
শহর কলকাতা থেকে দূরে, শহরের নোংরা, মশা, মাছি, রোগ ছাড়িয়ে চারদিক নির্মল সবুজের মাঝে ইউরোপিয় আদলে করা বিশ্রামবাড়ি। ইংরেজ সাহেবদের খুব প্রিয়। তাছাড়া ফূর্তিটা জমে ভাল, শহরে লোকজন ও সংবাদপত্রের নজর এড়িয়ে একেবারে উদ্দাম।
সেই ইংরেজ আমল থেকে চলে আসছে দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য। একটি নয়, তিনটি জমিদার বাড়ির পুজো, প্রায় পাশাপাশি। গাইন, বল্লভ ও সাউ - তিনটি বাড়িতেই দুর্গোৎসব হয়। বছরে একমাত্র তখনই আমজনতার প্রবেশাধিকার থাকে।

ধান্যকুড়িয়া গায়েনবাড়ি
কলকাতা থেকে বসিরহাট কিংবা টাকি যাবার সড়ক পথে ধান্যকুড়িয়া আসলেই টাকি রোডের উপর অবস্থিত ইংরেজ ক্যাসলের অনুকরণে নির্মিত গাইনদের সুন্দর বাগানবাড়িটি চোখে পড়বে।
পুজোর ছুটিতে দূরপাল্লার ভ্রমণে ট্রেন, বাস বা বিমান কিংবা হোটেল বুকিং না পেলে মনখারাপের কিছু নেই। বেরিয়ে পড়ুন সপরিবারে গাড়িতে, কিংবা ট্রেনে। তা একান্ত না হলেও উপায় আছে। রাজ্য সরকারের পরিবহণ বিভাগের পুজো পরিক্রমা প্যাকেজ। পুজোর কদিন ঘুরে আসা যায় ধান্যকুড়িয়া রাজবাড়িতে।
আজ থেকে প্রায় দুশো তিরিশ বছর আগের কথা। সুবিশাল এই রাজবাড়ি বানিয়েছিলেন ধান্যকুড়িয়ার জমিদার মহেন্দ্রনাথ গায়েন। সেসময় ফুলেফেঁপে উঠেছিল তাঁর পাটের ব্যবসা। মূলত ইংরেজদের সঙ্গেই চলত তাঁর লেনদেন। আর সেই সুবাদেই উত্তর ২৪ পরগণার এই প্রান্তিক অঞ্চলেও নিত্যদিন লেগে থাকত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের আনাগোনা। তাঁদের বিলিতি সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে উস্কে দিতেই ইউরোপীয় দুর্গের আদলে এই রাজবাড়ি নির্মাণ করেন মহেন্দ্রনাথ।
৩০ একর জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজবাড়ির মধ্যেই রয়েছে আস্ত এক পুষ্করিণী, যাতে রাজবাড়ির প্রতিচ্ছবি ঝলমল করে সারাদিন। গোটা দুর্গটিকে কেন্দ্র করে রয়েছে বিশাল এক বাগানও। দুর্গের ভেতরে ঢুকলেও রীতিমতো চমকে যেতে হবে। নানা ধরনের ভিক্টোরিয়ান কারুকাজ থেকে শুরু করে রয়েছে ইতালিয় কাচের তৈরি আসবাব। যা এক কথায় মন্ত্রমুগ্ধকর। গ্রীষ্মকালে এই রাজবাড়িতে এসে অনেক সময়ই ছুটি কাটাতেন ব্রিটিশ সাহেবরা। তাঁদের জন্য ছিল পৃথক নহবতখানা, অতিথিশালা। এমনকি সেসময় এই রাজবাড়ির জন্য পৃথক রেল স্টেশনও তৈরি করেছিল মার্টিন কোম্পানি।
ধান্যকুড়িয়া একসময় ছিল এক সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ। একসময় বহু সম্পন্ন পরিবারের বাস ছিল। যাঁরা এখানে তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তির নিদর্শন রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে গায়েন, বল্লভ ও সাউ পরিবার অন্যতম। এদের নির্মিত প্রাসাদোপম বাড়িগুলি এখনো আদিরূপ ধরে রেখেছে। প্রত্যেকটি বাড়িই দুশ বছর অতিক্রম করেছে। যেন ব্রিটিশ বাংলার একখণ্ড ইতিহাসের দলিল বহন করে চলেছে । এনারা ধান ও ইংরেজদের সঙ্গে পাটের ব্যবসা করে লাভবান হন। প্রভূত ধনসম্পত্তি করেন। এই তিন বাড়ির বৈভব ও জনহিতকর কার্যের নিদর্শন মেলে তাঁদের অট্টালিকা , বিদ্যালয়, স্থানীয় হাসপাতাল, লাইব্রেরী, রাসমঞ্চ প্রভৃতি স্থাপত্যে।
গায়েন রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে গুরু দত্তের সাহেব বিবি গোলাম, ইন্দো-ফরাসি প্রযোজনা লা ন্যুই বেঙ্গলি এবং উত্তম কুমার অভিনীত সূর্যতাপের মতো সিনেমার শুটিং হয়েছে। গাইন রাজবাড়ির ঠাকুরদালানের এক কোণে আপনি একটি দুর্গা প্রতিমা দেখতে পাবেন। গাইন পরিবার প্রায় ২০০ বছর ধরে একই কারিগর পরিবারের কাছে প্রতিমা তৈরির কাজ করে আসছে।
আরেকটু এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে বল্লভদের প্রাসাদোপম বাড়িটি। এই বাড়ির বহু অলংকৃত লোহার গেট, কোরিয়ানথিয়ান (corinthian) স্তম্ভের সমাহার, ও প্লাস্টারে স্টাকোর ( stucco ) কাজ দেখার মত। বাড়ির ছাদে কতগুলি বিভিন্ন আকৃতির মূর্তি বসানো ,তাই অনেকে পুতুলবাড়িও বলে।
আরো একটু এগোলে চোখে পড়বে সাউদের বাগানবাড়ির সুবিশাল, ভগ্নপ্রায় গেট। একটু ভেতরে বিশালকার বাগানবাড়ি। এক সময় যেখানে বসত মজলিস , আনন্দ ,গানের ফোয়ারা ছুটত। একই কারিগররা গাইন, সাউ এবং বল্লভদের জন্য দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেন। পুরোহিতদের একই পরিবার উৎসবে পুজো করে।
গাইন বাড়ির বংশধর, শিক্ষক ও লেখক মনজিত গাইন বলেন, “যদি কেউ আমাদের বাড়িগুলিকে পূর্ণ জাঁকজমকপূর্ণভাবে দেখতে চান, তাহলে দুর্গাপুজোই সেরা সময়। এই সময়ে প্রবেশের উপর কোনও বিধিনিষেধ নেই। আমাদের পূর্বপুরুষদের মতো, আমরা গ্রামবাসী এবং দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাই।”
কীভাবে যাবেন : সড়ক পথে, কলকাতা বা বারাসাত থেকে টাকি রোড ধরে ধান্যকুড়িয়া। বড় রাস্তার গায়েই নজর পড়বে গায়েন বাড়ির প্রকাণ্ড তোরণসহ গেট।
রেল পথে, শিয়ালদহ বা বারাসাত থেকে বসিরহাট লোকাল ধরে কাঁকড়া মির্জানগর । কাঁকড়া মির্জানগর স্টেশন থেকে গায়েন রাজবাড়ি পর্যন্ত স্থানীয় পরিবহন যেমন অটো এবং রিকশা। এক দিনেই ঘুরে আসা যায় এই প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন।
পরিবহণ বিভাগের পুজোয় কনডাক্টেড ট্যুর। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী সকাল আটটায় এসি বাস ছাড়বে এসপ্লানেড থেকে। সারাদিনের ট্যুর। যোগাযোগ করুন, www.wbtconline.in
কোথায় থাকবেন: এক দিনেই দেখে নেওয়া যায় ধান্যকুড়িয়া রাজবাড়ি। এখানে থাকার তেমন কোনও ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে টাকিতে থাকার অনেক হোটেল, রিসর্ট ইত্যাদি আছে।
ছবি - লেখকের নিজস্ব
লাইফস্টাইল-এর (Lifestyle) লেটেস্ট খবর এবং আপডেট জানার জন্য দেখুন এবিপি লাইভ। ব্রেকিং নিউজ এবং ডেলি শিরোনাম দেখতে চোখ রাখুন এবিপি আনন্দ লাইভ টিভিতে
আরও পড়ুন






















