Kolkata News: ‘কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়’, শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন তসলিমা নাসরিন
Taslima Nasrin: শহরে ফিরে আবেগে ভাসলেন সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন।

কলকাতা: শহরে ফিরে আবেগে ভাসলেন সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। কলকাতায় ফিরতে পারার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানালেন তিনি। সেই সঙ্গে ঘোষণা করলেন, "কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়।" তসলিমা জানালেন, দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরতে পারলেন তিনি। বললেন, "আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি, এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে ১৯ বছর লেগে গেল। প্রত্যেক দিন ঠিকানা হারানোর যন্ত্রণা। অনুভব করেছি আমি।" (Taslima Nasrin)
শনিবার রবীন্দ্র সদনে তসলিমাকে সম্বর্ধনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে বলতে শোনা যায়, "বাংলায় সকলের কথা বলার অধিকার রয়েছে। যতবার ইচ্ছা বাংলায় আসবেন। নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশমন্ত্রীর। বন্ধনমুক্ত বাংলায় সকলকে স্বাগত, ধমক চমক এখন অতীত। শ্চিমবঙ্গের ব্যবস্থার যা পরিবর্তন হয়েছে, সেটা আপনি দেখেছেন। শুধু মুখের পরিবর্তন হয়নি, ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। গতকাল বঙ্গভূমিতে পদার্পণ করেছেন তসলিমা নাসরিন। এটার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত যে নতুন সরকারের হাতে বাংলার গণতন্ত্র, সংবিধান, বাক স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত। এখানে কোনও ধমক, চমক, দেখে নেব, আটকে দেব-এসব জিনিস অতীত হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে আপনি স্বাগত। পশ্চিমবঙ্গে যে ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, তা নিশ্চিত ভাবে আপনার অভিজ্ঞতায় আপনি দেখেছেন। একবার নয়, যখনই মনবে করবেন, বার বার আসবেন। সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর।" (Kolkata)
এর পর বক্তৃতা করতে ওঠেন তসলিমা। তিনি বলেন, "আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি। এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে প্রায় ১৯ বছর লেগেছে। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা, প্রতিটি মাস অপেক্ষা, প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখ। আজ সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি, আমার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছি। আজ আপনারা যে ভালবাসা ও সম্মান দিয়েছেন, তার জন্য গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ আমি। আমাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সেক্যুলার মিশনের চেয়ারম্যান ওসমান মল্লিক। প্রায় অসম্ভব বলে মনে হওয়া আমার ফেরার বন্ধ দরজায় তিনিই প্রথম সাহস করে কড়া নেড়েছিলেন। তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও আমাকে সম্বর্ধনা দিয়েছেন। তাঁর এই উদারতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এ আসলে আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি বিস্মিত, মুগ্ধ, অভিভূত।"
তসলিমা আরও বলেন, "একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে আসতে পুলিশের পাহারার প্রয়োজন হওয়াটাই আমাদের সময়ের এক বেদনাদায়ক সত্য। লেখকের জীবন রক্ষা করা শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়, তাঁর কথা বলার অধিকারস ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার এবং কলমের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করা। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি যেদিন কোনও লেখককে লেখার জন্য পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না, মুক্ত চিন্তককে সত্য উচ্চারণের অপরাধে দেশত্যাগ করতে হবে না। আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি আমি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না। আবার মতভিন্নতাও আমাকে অকৃতজ্ঞ করে না। কোনও ভাল কাজের স্বীকৃতি দিতে দলীয় আনুগত্যের প্রয়োজন নেই। দ্বিমত প্রকাশ করতেও বিদ্বেষের প্রয়োজন নেই। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে এখানে কথা বলতে আসিনি, কোনও দলকে পরাজিত করতেও আসিনি। এসেছি নারীর সমানাধিকার, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ, মুক্ত চিন্তা এবং বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে। আজকের দিনটি সাক্ষ্য দিচ্ছে, ভয় চিরস্থায়ী নয়, নিষেধাজ্ঞা চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না।"
অগাস্ট মাসে কলকাতায় ফেরাকে প্রত্যাবর্তনের মাস বলেও উল্লেখ করেন তসলিমা। তিনি বলেন, "আজ ১ অগাস্ট। অগাস্ট আমার জন্মের মাস, অগাস্ট আমার নির্বাসনের মাস, আজ থেকে অগাস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও। ১৯৯৪ সালের ৮ অগাস্ট আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তখনকার সরকার। রাতের অন্ধকারে স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার পর একের পর এক সরকার এসেছে, কিন্তু ওই দরজা আর খোলেনি। আর মাত্র সাত দিন পর আমার নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হবে। স্বদেশের বাইরে কাটানো সময় এরই মধ্যে স্বদেশে কাটানো সময়কে অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার ভিতর থেকে দেশকে সরাতে পারেনি। বাংলা ভাষাই আমার বহনযোগ্য স্বদেশ, যে স্বদেশ আমি সঙ্গে করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে বেরিয়েছি। এক বাংলায় আমার জন্ম, আর এক বাংলায় হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত একজন বাঙালি লেখকের জন্য দুই বাংলার কোথাও একটি ছোট্ট ঘরও রইল না। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং আশ্রয় দিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু নাগরিকত্ব এবং আপনত্ব এক জিনিস নয়। নিরাপদ বাড়ি পাওয়া যায়, ঘর তৈরি হয় ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের ভালবাসায়। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজকের নয়। সাতের দশকে ময়মনসিংহে বসে কলকাতার সাহিত্য পড়েছি, গান শুনেছি, রেডিওয় নাটক শুনেছি। বাস্তবে দেখার আগেই বই, সুর আর মানুষের কণ্ঠের ভিতর আবিষ্কার করেছিলাম কলকাতাকে। ১৯৭৮ সালের সেঁজুতি নামের একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ডাকযোগে কবিতা আসত। কাঁটাতারের ওপার থেকে খামের ভিতর উড়ে আসত শব্দ। আমি সেই কবিতা ছাপাতাম। পশ্চিমবঙ্গের লিটল ম্যাগাজিনেও লিখতাম। রাজনীতি যখন বাংলাকে ভাগ করেছিল, কবিতা তৈরি করেছিল সেতু। আটের দশকের শেষ দিকে কলকাতা আসা শুরু করলাম। নয়ের দশক থেকে এখানে আমার বই প্রকাশিত হয়। বাংলাকে কখনও এপার ওপার বলে অনুভব করিনি। কাঁটাতার ভূখণ্ড ভাগ করতে পারে, ভাষাকে ভাগ করতে পারে না। নির্বাসনের পথে দেশ খুঁজতে খুঁজতে একদশক পর কলকাতায় একটি ঘর পেয়েছিলাম। এখানে আমি সুখে, স্বস্তিতে ছিলাম, সৃষ্টিশীল ছিলাম। আমার বই 'দ্বিখণ্ডিত' নিষিদ্ধ হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দেয়। তবু ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। আমি কোনও অপরাধ করিনি। কোনও আদালত আমাকে নির্বাসনের সাজা দেয়নি। তবু মৌলবাদীদের হুমকির মূল্য দিতে হল আমাকে। আমার ঘর, শহর, পাঠক, স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে...আমার দেশেও আমি অপরাধ করিনি। আমার দেশ বাংলাদেশ আমাকে শাস্তি দিয়েছিল। ৩২ বছর আগে নির্বাসন দিয়েছিল আমাকে। কী দোষ ছিল আমার? কাউকে হত্যা করেছিলাম, কারও ঘর পুড়িয়েছিলাম? আমি ডাক্তারি করেছি আর আমার গল্প-কবিতা-প্রবন্ধে কিছু সহজ কথা লিখেছি। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা লিখেছি, লিখেছি ধর্ম-বর্ণ-জাত বা লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সমান মানবাধিকারের কথা। বলেছি, কোনও বিধান, তার উৎস ধর্ম, সমাজ, পরিবার বা রাষ্ট্র যাই হোক, মানুষের স্বাধীনতা, সমতা এবং মর্যাদা কেড়ে নিলে সেই বিধান বদলাতে হবে। সেই কথাগুলিকেই অপরাধ বলা হল। আমাকে হত্যার জন্য মিছিল বেরোল দেশে। ফতোয়া জারি করে মাথার মূল্য জারি হল। রাষ্ট্র আমার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বদলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করল। শেষ পর্যন্ত দেশ থেকে বের করে দিল আমাকে।"
আরও পড়ুন: লক্ষ লক্ষ বই ধ্বংস করছে AI সংস্থাগুলি, প্রযুক্তির পিছনে দৌড়তে গিয়ে ক্ষতি হচ্ছে বিরাট
নিজের নির্বাসনকালের জন্য রাষ্ট্রকে দায়ী করে তসলিমা বলেন, "আমার নির্বাসন নিছক ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা নয়। রাষ্ট্রপের নৈতিক ব্যর্থের ইতিহাস সেটি। রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকার রক্ষার বদলে ধর্মীয় হুমকির কাছে যখন নতি স্বীকার করে, শুধু লেখক নন, আইনের শাসন, ন্যায় বিচার, রাষ্ট্রের নৈতিক সাহসও নির্বাসিত হয়। আমাকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠা করেনি। নিরস্ত্র লেখকের অধিকার বিসর্জন দিয়ে সাময়িক নীরবতা কিনেছিল। একজন লেখককে সরিয়ে দিলে একদিনের জন্য হয়ত রাস্তা শান্ত হয়, কিন্তু রাষ্ট্র দুর্বল হয়। শক্তিশালী হয় হুমকিদাতা। শিখে যায়, আরও জোরে হুমকি দিলে রাষ্ট্র নত হবে। ভয়ের কাছে আপস শান্তি আনে না, পরবর্তী হুমকির ভিত্তি তৈরি করে। একটি সভ্য সমাজে যুক্তির উত্তর আর একটি যুক্তি। একটি বইয়ের উত্তর আর একটি বই। কোনও মত অপছন্দ হলে প্রতিবাদ করুন, খণ্ডন করুন, পাল্টা লিখুন। কিন্তু লেখককে হত্যা করতে যাবেন না। কারাগারে নিক্ষেপ করবেন না। তার দেশ,ভাষা, পাঠক, ঘর থেকে নির্বাসিত করবেন না। যে স্বাধীনতা শুধুমাত্র নিজের পছন্দের কথার জন্য, তা বাক স্বীধানতা নয়। একটি সমাজের সভ্যতা বোঝা যায়, তার অপ্রিয় ও অজনপ্রিয় মত কতটা মত, তা দিয়ে। মতভিন্নতা সভ্যতার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। মতের উত্তরে হত্যার হুমকি সভ্যতার পরাজয়। আমি কোনও মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করি না। আমি লড়াই করি অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে। সেই সব মতাদর্শের বিরুদ্ধে যা নারীকে পুরুষের অধীন করে, শিশুকে যুক্তির বদলে অন্ধ আনুগত্য শেখায়, ধর্ম এবং ঈশ্বরে অবিশ্বাসকে অপরাধ বলে, ভিন্নমত বা ভিন্নমতের মানুষকে ঘৃণা করতে বা হত্যা করতে শেখায়। আমি সব ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধী। ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বেশি সরব কারণ শৈশব থেকেই কাছ থেকে দেখেছি। ইসলামি আইনে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য দেখেছি, অমুসলিম, নাস্তিক এবং মুক্ত চিন্তকদের উপর নিপীড়ণ দেখেছি, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা এবং স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখেছি, বিশ্ব জুড়ে জিহাদি-উগ্রপন্থীদের সন্ত্রাস এবং হত্যাকাণ্ড দেখেছি। তাই এর নাম স্পষ্ট করে বলি। আমি সব ধর্মের মৌলবাদকে এক সারিতে রাখি না। অন্যান্য ধর্মের মৌলবাদের কথা বলে ইসলামি মৌলবাদকে আড়াল করি না। যে অন্যায় যেখানে ঘটবে, যে মতাদর্শ তার জন্য দায়ী, নাম ধরে সমালোচনা করি। সত্যকে ভারসাম্যের অস্পষ্ট করা নিরপেক্ষতা নয়। বরং তা সত্যের সঙ্গে আপস। ইসলামের সমালোচনা মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ নয়। মানুষের অধিকার আছে, মতাদর্শের নেই। মানুষকে রক্ষা করতে হবে, মতাদর্শকে প্রশ্ন করতে হবে। মুসলিমের শুভাকাঙ্খী হওয়া মানে তাদের ধর্মীয় শাসনের বন্দিত্বে রেখে দেওয়া নয়। আমি চাই মুসলিম সমাজে মুসলিম সমাজে মুক্ত চিন্তার চর্চা বাড়ুক, যুক্তিবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের সংখ্যা বাড়ুক, নারীরা পূর্ণ সমানাধিকার পাক, কারও মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হোক। কোনও মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ইসলামের সমালোচনা করা, ইসলাম সম্পর্কে সত্য কথা বলা মুসলিম বিদ্বেষ নয়। বরং মুসলিম সমাজের সংস্কার, বিবর্তন এবং মানুষের মুক্তির জন্য সমালোচনা অত্যন্ত জরুরি। আজ বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক সমাজে খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম, ইহুদি ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, কোনও ধর্মই নীতিগত ভাবে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ধর্ম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেই এই সব সমাজ বহু পুরনো বৈষম্য এবং কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে এসেছে।।"
তসলিমা আরও বলেন, "খ্রিষ্টান বিশ্বে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করলে মানুষকে মেরে ফেলা হতো। স্প্যানিশ ইনকুইজিশন ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়। মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে ইসলামি ইনকুইজিশন চলছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আইন, ফতোয়া, কারাবাস, গণপিটুনি, হত্যার হুমকি এবং নির্বাসন-সবকিছুর উদ্দেশ্য এক, সংস্কারক বা সমালোচকের মুখ বন্ধ করো। এই কারণেই মুসলিম সমাজের মুক্তচিন্তকদের কেউ খুন হয়েছেন, কেউ কারাগারে, কেউ নির্বাসনে। আমরা যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করছি, আমরা চাই মুসলিম সমাজও অন্ধ আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে যুক্তি, সমতা, মানবাধিকার এবং আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাক। আমরা সমালোচনা করি ধ্বংস করার জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য। যে বিধান নারীকে পুরুষের যৌনদাসী হিসেবে গণ্য করে, অমুসলিমকে ঘৃণা করে, ইসলামের সমালোচককে হত্যা করে, সেই বিধানকে প্রশ্ন করতেই হবে। আরও বেদনাদায়ক হল, মুসলিম সমাজকে অন্ধকারে রাখতে শুধু উগ্রপন্থীরাই সক্রিয় নন, তথাকথিত প্রগতিশীল এবং বামপন্থীদের একটি অংশ এই অচলাবস্থাকে রক্ষা করে। নিজেরা বাক স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার ভোগ করেও, ইসলামের সমালোচক এবং সংস্কারকদের মুসলিম বিদ্বেষী আখ্যা দেন। আমি অহরহ তাঁদের আক্রমণের শিকার হই। তাঁদের অভিযোগ, আমি কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টাম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে একই ভাবে যুদ্ধ করছি না? তাঁরা কি একই যুক্তিতে রাজা রামমোহন রায়কে বাতিল করেন এই বলে যে তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে লড়েছেন কিন্তু পৃথিবীর সব ধর্মের, সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে লড়েননি? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কি কেউ দোষ দিয়েছিলেন যে তিনি হিন্দু বিধবাদের অধিকারের জন্য লড়লেন, অন্য ধর্মের সংস্কার করতে গেলেন না কেন? সমাজ সংস্কারকরা সমাজের সবচেয়ে পরিচিত অন্যায় থেকে লড়াই শুরু করেন। আমার ক্ষেত্রে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে কেন? ইসলামি জিহাদি-জঙ্গিরা সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হুমকি ও হত্যা ব্যবহার করে। মৌলবাদের কাছে নত রাষ্ট্র ব্যবহার করে আইন, কারাগার এবং নির্বাসন। আর তথাকথিত প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থীরা ব্যবহার করেন অপবাদ, উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ এবং সামাজিক বর্জন। পদ্ধতি আলাদা কিন্তু ফল একই। ইসলামের সমালোচনা বন্ধ হয়, মুসলিম নারীর বঞ্চনা অক্ষত থাকে, মুসলিম সমাজের বিবর্তন থেমে থাকে। যাঁরা নিজেদের জন্য আধুনিকতা চান, কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য চান মধ্য়যুগীয় বিধান, তাঁরা মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু। যাঁরা নিজেদের মেয়ের স্বাধীনতাকে অধিকার বলেন, কিন্তু মুসলিম মেয়ের পরাধীনতাকে সংস্কৃতি বলেন, তাঁরা মোটেও প্রগতিশীল নন। মুসলিম বিশ্বের বহু সমাজে এখনও সপ্তম শতাব্দীর সামাজিক বাস্তবতায় তৈরি নারীবিরোধী, বৈষম্যমূলক বিধানকে চিরন্তন আইন হিসেবে মানা হয়। ক্যালেন্ডার এগোলেই সমাজ আধুনিক হয় না। হাতে আধুনিক প্রযুক্তি এলেই, শহরে উঁচু ভবন উঠলেই সমাজ আধুনিক হয় না। আধুনিক হতে হলে আইন, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রচিন্তাকেও আধুনিক হতে হয়। কোনও প্রাচীন বিধানকে আজকের মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং সমতার মানদণ্ডে অন্যায় মনে হলে তা বদলাতে হবে। আমি মানুষের ধর্মমানার, ধর্ম গ্রহণ করার, ধর্ম প্রচারের অধিকার মানি। একই সঙ্গে ধর্ম ত্যাগ করার, ধর্ম না মানার এবং ধর্মের সমালোচনার অধিকারও মানি। বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিশ্বাসকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তোলে না। বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকলে অবিশ্বাসের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা শুধুমাত্র সব ধর্মের উৎসবে যোগ দেওয়া নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা হল, রাষ্ট্র, আইন, রাজনীতি এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে পৃথক রাখা। রাষ্ট্রের কাজ কোনও ধর্মকে রক্ষা করা নয়, বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী সব নাগরিকের সমানাধিকার রক্ষা করা। রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না। রাষ্ট্রের থাকবে ন্য়ায়। আইনের কোনও ধর্ম থাকবে না, আইনের থাকবে সমতা। একজন নারীর অধিকার তাঁর জন্ম বা ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নির্ভর করতে পারে না। জীবন তাঁর নিজের, শরীর তাঁর নিজের, সিদ্ধান্তও তাঁর নিজের। কোনও ধর্মীয় আইন নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দিলে, সেই আইন বাতিল করতে হবে। ধর্মের মর্যাদার চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়। একই দেশে নাগরিকের অধিকার ধর্মভেদে আলাদা হতে পারে না। ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার। তবে তা সংখ্যাগুরু ধর্মের বিধান নয়, সংবিধান, মানবাধিকার এবং নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে রচিত হবে নাগরিক আইন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, বাক স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলে এসেছি। বিপদ এসেছে, নির্বাসন এসেছে, একাকিত্ব এসেছে কিন্তু আমার বিশ্বাস বদলায়নি। বাংলাদেশে আজ মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ভয়াবহ। রাজীব হায়দর, অভিজিৎ রায়, ওয়াসিকর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নিলয় নীল ফয়সল-সহ অনেক সাহসি মুক্তচিন্তকদের জিহাদিরা নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে। অপরাধ তাঁরা প্রশ্ন করেছিলেন। ইসলামের বৈষম্যমূলক বিধানের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের হত্যা করে সমাজকে বার্তা দেওয়া হয়েছে, প্রশ্ন করলে মৃত্যু, নীরব থাকলে জীবন। আমি সেই শর্ত মানি না। নীরবতার বিনিময়ে যে জীবন কিনতে হয়, সেটি স্বাধীন জীবন নয়। কিন্তু প্রশ্নকে হত্যা করা যায় না। প্রশ্নকারীকে হত্যা করলে আরও বহু মানুষের কণ্ঠে প্রশ্ন ফিরে আসে। যে সমাজ সমালোচককে হত্যা করে, কারাগারে পাঠায় বা নির্বাসিত করে, সেই সমাজ সমালোচককে নয়, নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে, বন্দি করে বা নির্বাসিত করে।"
ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে নিজের ভাবনা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, "তার পরও আমি আশা ছাড়ি না। আশা করি, একদিন বাংলাশেদেও রাষ্ট্র এবং ধর্ম পৃথক হবে,নারী সমানাধিকার পাবে, সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বাস করবে, নাস্তিক এবং মুক্ত চিন্তকরা নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই রাস্তায় হাঁটতে পারবে। আশা কোনও অন্ধ আশাবাদ নয়। অন্ধকারের অস্তিত্ব জেনেও আলো তৈরি করার জেদ। আমি এমন এক উপমহাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে ধর্মান্ধতার পরিবর্তে বিজ্ঞানমনস্কতা, অজ্ঞতার বদলে শিক্ষা, বর্বরতার বদলে মানবিকতা এবং পশ্চাদপদতার বদলে আধুনিকতা থাকবে। মৌলবাদ অজ্ঞতা, বিদ্বেশ এবং হিংসাকে নিয়ে দাবানলের মতো ছড়ায়। আর দাবানল কাঁটাতার মানে না। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ উপমহাদেশে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটিয়েছিল। ধর্মের নামে আর কোনও দেশভাগ নয়, আর কোনও রক্তপাত, আর কোনও নির্বাসন নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক সততা, সমতা, সহিষ্ণুতা, উদারতা, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। এই স্বপ্ন নিয়ে আজ আবার কলকাতার সামনে দাঁড়িয়েছি। কলকাতা, এত বছর আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি, আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হয়েছে? আজ উত্তর চাইতে আসিনি। বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে জল, মনে অভিমান আছে, দুই হাত ভরা ভালবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, সেখানে ফেরার স্বপ্ন এতবছর দেখেছি। আমি জানি, চলে যাওয়া এবং ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর কেউ আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু আজকের এই দরজা খোলা প্রমাণ করে, অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। কলকাতায় ফেরা শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত আনন্দন নয়, এটি নির্বাসন ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বাক স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তা এবং মানুষের ভালবাসার জয়। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, লিখব। যা সত্য বলে বিশ্বাস করি বলব। আজ ১ অগাস্ট, আজ একটি বন্ধ দরজা খোলার দিন। ইতিহাস যেমন মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, তেমনই মনে রাখে, কারা দরজা খুলেছিল। কোনও মানচিত্র নয়, মানুষের ভালবাসাই আমাদের দেশ।"























