Success Story: হ্যারিকেনের আলোয় পড়াশোনা, পরিবারের আয় ছিল দেড় হাজার, অন্ধকার ঘর থেকে IAS অফিসার এই যুবক
অংশুমানের মা ছিলেন একজন ‘শিক্ষা মিত্র’। মাসে তাঁর আয় ছিল মাত্র ১৫০০ টাকা। সেই সামান্য আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি গ্রামের একটি বিউটি পার্লারও চালাতেন

কলকাতা: স্বপ্নটা ছিল বড়। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল তার ঠিক উল্টো। বিহারের বক্সার জেলার নওয়ানগর গ্রামের অঙ্কুশ/অংশুমান রাজ ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন অভাব। গ্রামে ঠিকমতো বিদ্যুৎ ছিল না, রাস্তার পরিকাঠামোও ছিল সীমিত। ফলে পড়াশোনার জন্য অনেক সময় কেরোসিনের বাতির আলোই ছিল তাঁর ভরসা। সেই অন্ধকার ঘর থেকেই একদিন UPSC-র মতো কঠিন পরীক্ষায় সাফল্য এনে IAS অফিসার হন তিনি। ২০১৯ সালে UPSC Civil Services Examination-এ তাঁর All India Rank ছিল ১০৭। কিন্তু এই সাফল্যের পিছনে ছিল শুধু পড়াশোনা নয়, ছিল পরিবারের কঠিন লড়াইও।
মায়ের মাসিক আয় মাত্র ১৫০০ টাকা
অংশুমানের মা ছিলেন একজন ‘শিক্ষা মিত্র’। মাসে তাঁর আয় ছিল মাত্র ১৫০০ টাকা। সেই সামান্য আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি গ্রামের একটি বিউটি পার্লারও চালাতেন। কারণ সংসারের পরিস্থিতি তখন মোটেই ভালো ছিল না।
২০০২ সালে তাঁর বাবার চালকলের ব্যবসায় বড়সড় ক্ষতি হয়। পরে তাঁর বাবা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ফলে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম মানুষ হয়ে ওঠেন তাঁর মা। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে অংশুমানের উপরও দায়িত্ব ছিল। তাই তাঁর কাছে IAS হওয়া শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণের গল্প ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের ভবিষ্যৎও।
চাকরি করেও UPSC-র প্রস্তুতি
২০১৩ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর অংশুমান একটি হংকং-ভিত্তিক সংস্থায় Marine Engineer হিসেবে চাকরি নেন। কিন্তু এখানেও UPSC-র প্রস্তুতি থামেনি।
তাঁর চাকরির ধরন ছিল এমন যে একটানা প্রায় ছয় মাস তাঁকে জাহাজে থাকতে হত। অনেক সময় ইন্টারনেটের সুবিধাও থাকত না। ছয় মাস কাজ করার পর তিনি পেতেন প্রায় তিন মাসের ছুটি। সেই সময়টুকুই কাজে লাগাতেন UPSC প্রস্তুতির জন্য। দিল্লির দামি কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না। তার উপর বাড়িতে প্রায় ৩০ জনের যৌথ পরিবার। তাই নিরিবিলি পড়াশোনার জন্য তিনি ভাইয়ের কাছে হলদিয়ায় যেতেন।
প্রথমবার Prelims পাস, কিন্তু Mains-এ ধাক্কা
২০১৬ সালে প্রথমবার UPSC Prelims পাস করেন অংশুমান। কিন্তু Mains-এ খুব অল্প ব্যবধানে কাট-অফ মিস করেন। ব্যর্থ হয়ে থেমে যাননি। আবার জাহাজে ফিরে যান। ছয় মাসের চাকরি। তারপর আবার প্রস্তুতি। ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার Mains পাস করলেন। এবার সামনে Interview। কিন্তু তখন তিনি কাজের জন্য ব্রাজিলে ছিলেন। হাতে প্রস্তুতির জন্য ছিল মাত্র প্রায় ২০ দিন। শেষ পর্যন্ত Interview-তে সফল হতে পারেননি। একবার নয়, বারবার ধাক্কা এসেছে। কিন্তু লক্ষ্য বদলায়নি।
পরীক্ষার এক মাস আগে ভয়াবহ অসুস্থতা
২০১৮ সালের পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় আরও বড় বাধা এল। Mains পরীক্ষার প্রায় এক মাস আগে তিনি Appendicitis-এ আক্রান্ত হন। তীব্র যন্ত্রণা এবং বারবার বমির মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরে পরীক্ষার পর তাঁর অস্ত্রোপচার হয়।
তবু সেই বছরই UPSC-র প্রতিটি ধাপ সফলভাবে পেরিয়ে তিনি Indian Revenue Service (IRS)-এ নির্বাচিত হন। অনেকের কাছে এটিই হয়তো স্বপ্নপূরণের শেষ ধাপ। কিন্তু অংশুমানের স্বপ্ন ছিল আরও বড়। তিনি IAS হতে চেয়েছিলেন। IRS হয়েও থামলেন না। ২০১৮ সালে IRS-এ নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি আবার UPSC পরীক্ষায় বসেন।
কারণ এবার লক্ষ্য ছিল আরও ভালো Rank এবং IAS। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে সেই স্বপ্ন পূরণ হল। UPSC Civil Services Examination-এ All India Rank 107। কেরোসিনের আলোয় পড়া সেই গ্রামের ছেলে পৌঁছে গেলেন দেশের অন্যতম কঠিন প্রশাসনিক পরিষেবায়।
তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
অংশুমানের নিজের কথাতেই তাঁর লড়াইয়ের আসল ছবিটা পাওয়া যায়। তিনি এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি নিয়েছেন যেখানে একটানা পড়াশোনার সুযোগ ছিল না। চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি UPSC-তে মন দেওয়ার মতো আর্থিক নিরাপত্তাও ছিল না। তাই তাঁর প্রস্তুতি হয়েছিল ছোট ছোট সময়ের মধ্যে, ধাপে ধাপে। আর সেখানেই তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা— সাফল্যের জন্য সবসময় নিখুঁত পরিস্থিতির অপেক্ষা করতে হয় না। সবসময় বড় শহর, দামি কোচিং বা নিখুঁত স্টাডি রুম থাকতেই হবে—এমন নয় প্রয়োজন লক্ষ্য ঠিক রাখা, নিজের পরিস্থিতিকে বুঝে পরিকল্পনা করা এবং ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার সাহস। অংশুমান রাজ সেটাই করেছেন।
কেরোসিনের বাতি থেকে UPSC-র সাফল্য—তাঁর গল্প প্রমাণ করে, সুযোগ কম হতে পারে, কিন্তু চেষ্টা থামিয়ে দিলে স্বপ্নটাই হারিয়ে যায়।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI






















