Heatwaves: তাপপ্রবাহকে 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' হিসেবে ঘোষণা কেন্দ্রের, কারণ কী ? এতে কী পরিবর্তন ঘটবে ?
Heatwaves now natural calamity in India: প্রতিবছর তাপপ্রবাহে ভারতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ যায়। মৃতদের অধিকাংশই সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষ। তাপপ্রবাহ নিয়ে কী পরিকল্পনা কেন্দ্রের ?

দিল্লি: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে আমরা বন্যা বা সাইক্লোনের মত বিপর্যয়কে বোঝাই। কিন্তু এই তালিকায় এবার যুক্ত হল তাপপ্রবাহ। 'হিট ওয়েভ' (heat wave) বা তীব্র তাপপ্রবাহ এবং বজ্রপাতকে ভারতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করল কেন্দ্র সরকার। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য সরকারগুলি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৫-এর অধীনে ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানের জন্য আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।
রাজ্য সরকার, নীতি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ সংগঠন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির বিভাগীয় প্রধান কৃষ্ণ এস ভাটসা এই বিষয় নিয়ে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সময়ে তাপপ্রবাহ একটি গুরুতর দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে ভারতে। তাই সরকার এর মোকাবিলা করতে এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
তাপপ্রবাহের কারণে কতজনের মৃত্যু হয়েছে?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে দেশে হিটস্ট্রোকে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে মহারাষ্ট্রে। মৃত্যুর পাশাপাশি এই সময়ে তেলেঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, অন্ধ্র প্রদেশ, রাজস্থান, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট এবং কর্ণাটক সহ বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় ৫,০০০ মানুষ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
ত্রাণ নিয়ে কী মত কেন্দ্রের ?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক লোকসভায় একটি লিখিত উত্তরে জানিয়েছে যে, ২০২৬-৩১ সময়কালের জন্য রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল (এসডিআরএফ) এবং জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল (এনডিআরএফ)-এর কার্যপ্রণালী নির্দেশিকায় তাপপ্রবাহ এবং বজ্রপাতকে ঘোষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় জানিয়েছেন যে, এসডিআরএফ এবং এনডিআরএফ-এর মাধ্যমে ত্রাণ সহায়তা প্রদানের জন্য এখন একটি সুস্পষ্ট নীতি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও, দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিলের অধীনে তাপপ্রবাহ প্রতিরোধ ও ঝুঁকি হ্রাস প্রকল্পগুলোও আর্থিক দিক থেকে সহায়তা পাবে।
আগে নিয়ম কী ছিল এবং এখন কী পরিবর্তন হবে?
এখন পর্যন্ত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় তাপপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই তালিকায় কেবল ১২টি বিভাগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেগুলো হল, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্প , অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, সুনামি, শিলাবৃষ্টি, ভূমিধস, তুষারধস, মেঘভাঙা বৃষ্টি, কীটপতঙ্গের আক্রমণ এবং হিম/শীতল প্রবাহ। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন তাপপ্রবাহকে ঘোষিত দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য পর্যাপ্ত কারণ খুঁজে পায়নি। তাই, রাজ্যগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তাপপ্রবাহের ঘোষণা করতে হত এবং এর কারণে ত্রাণের জন্য এসডিআরএফ-এর বার্ষিক বরাদ্দের সর্বোচ্চ ১০% অর্থ ব্যয় করতে পারত।
কিন্তু, নতুন বিজ্ঞপ্তির ফলে রাজ্য সরকারগুলি রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রশমন তহবিল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে পারবে। কোনো বড় সংকটের সময় রাজ্যের তহবিল অপর্যাপ্ত হলে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল (এনডিআরএফ) থেকেও সাহায্য নিতে পারবে।
ভারতে তাপপ্রবাহ এবং বজ্রপাতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিসংখ্যান -
ভারতে বজ্রপাত হল সবচেয়ে মারাত্মক আবহাওয়া সম্পর্কিত প্রাকৃতিক একটি দুর্যোগ। এতে প্রতি বছর প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ জন মানুষ মারা যান। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট মৃত্যুর ৩৫ শতাংশেরও বেশি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন গ্রামীণ এলাকার মানুষেরা। কারণ, বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় ঘটে। খোলা মাঠে কর্মরত কৃষক, কৃষি শ্রমিক এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
হিটস্ট্রোকের ঘটনা বাড়ছে -
২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সরকারি তথ্য় অনুযায়ী, হিটস্ট্রোকের ৪,৮৫৩টিরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে হিটস্ট্রোকের ফলে মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা সরকারের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
কত টাকার আর্থিক ক্ষতি হয় এই বিপর্যয় থেকে ?
বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য হল ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ। বিশেষ করে বিহার ও ওড়িশার জন্য ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রতি বছর ১২০-১৫০ মিলিয়ন-এরও বেশি অর্থ ব্যয় করে সরকার। এছাড়াও, গবাদি পশু, কৃষি উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর জন্যও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
ভারতের কোন এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
পূর্ব ভারত এবং ছোটনাগপুর মালভূমি এলাকা। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম। তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হল রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশ, যেখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়শই ৪৫ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হয়ে যায়। মহারাষ্ট্র , তেলেঙ্গানা এবং উত্তর কর্ণাটকে গ্রীষ্মের শুরুতে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। অন্যদিকে বর্ষার সময়ে বজ্রপাতের ঘটনাও বেড়ে যায়। আবার আসাম, মেঘালয়, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বজ্রপাতের হার বেশি। এর কারণ হলো হিমালয়ের পাদদেশের উঁচু ঢালের ফলে সৃষ্ট ভূ-প্রাকৃতিক উত্থান।






















