এক্সপ্লোর

প্রাণীদের স্বচিকিৎসা পদ্ধতি, কী এই জুফার্মাকোগনোসি

এই শাস্ত্র পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা প্রাণীদের প্রাকৃতিক ওষুধি উদ্ভিদ ধ্বংস করি, তাহলে তারা বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারাবে। বিস্তারিত পড়ুন

ড. উৎপল অধিকারী

মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই প্রকৃতির মধ্যে চিকিৎসা ও ওষুধের সন্ধান করেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাছে নানা বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে শুধু মানুষ নয়, প্রাণীরাও নিজেদের অসুস্থতা নিরাময়ে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে। এই প্রাকৃতিক আচরণকে বলা হয় ‘জুফার্মাকোগনোসি’(zoopharmacognosy)। এই জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাণীরা রোগ নিরাময়ে প্রকৃতি থেকেই নানা ধরনের প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করে থাকে। ‘জুফার্মাকোগনোসি’ শব্দটি গঠিত হয়েছে তিনটি গ্রিক শব্দ থেকে- জ্যু (প্রাণী), ফার্মা (ওষুধ), ও গোনোসিস (জ্ঞান)। প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন মার্কিন বিজ্ঞানী ইলিয়েন রোসেনথাল এঙ্গেল। যিনি প্রাণীদের ঔষধি আচরণ ও জ্ঞান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ১৯৮০-র দশকে। এই শাস্ত্রের মূল লক্ষ্য হল, প্রাণীরা কীভাবে তাদের পরিবেশ থেকে ঔষধি গাছ, খনিজ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক পদার্থ বেছে নিয়ে রোগ নিরাময় করছে তা অধ্যয়ন করা।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যায় আফ্রিকার শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে। তানজানিয়ার বিখ্যাত গবেষক জেন গুড অল প্রথম লক্ষ্য করেন যে, অসুস্থ শিম্পাঞ্জিরা বিশেষ কিছু পাতা খায়, যা তাদের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।

পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, তারা ভারনোনিয়া অ্যামিগড্যালিনা নামের একটি তিতো পাতা খায়, যাতে শক্তিশালী অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক যৌগ বা জীবাণুনাশক পদার্থ রয়েছে। এই পাতার রস তাদের অন্ত্রের পরজীবী দূর করে ও হজমশক্তি বাড়ায়।

একইভাবে রুয়ান্ডার গরিলারাও বিশেষ কিছু মাটির কাদা চেটে খায়, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে থাকা ক্যালসিয়াম ও ক্লে মিনারেল তাদের খাদ্যে থাকা বিষাক্ত পদার্থকে নষ্ট করে। এই আচরণকে বলা হয় জিওফ্যাগি(মাটি খাওয়া), যা অনেক প্রাণীর মধ্যেই দেখা যায়।

কেনিয়ার হাতিরা গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে একটি বিশেষ গাছের ছাল খায়, যারা বোরাজিনিয়েসি পরিবারভুক্ত একটি উদ্ভিদ। স্থানীয় মানুষও এই গাছকে গর্ভপ্রসবজনিত কারণে যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। গবেষকরা মনে করেন, হাতিরাও ঐ একই উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করে, অর্থাৎ প্রসবযন্ত্রণা কে কিছুটা প্রশমিত করতে। এই ঘটনাগুলি থেকে বোঝা যায়, প্রাণীরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রাকৃতিক ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহল। এছাড়াও জঙ্গলের মধ্যে তারা কোন কোন স্থানের মাটি চেটে খায়। সেসব স্থানের মাটিকে পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাতে লবণের ভাগ বেশি থাকে।


প্রাণীদের স্বচিকিৎসা পদ্ধতি, কী এই জুফার্মাকোগনোসি

জুফার্মাকোগনোসি (zoopharmacognosy) শুধু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক পাখিরাও এই আচরণ দেখায়। যেমন, স্টারলিং নামের পাখি তাদের বাসায় সুগন্ধি ভেষজ যেমন বন্য গাজর বা ইউক্যালিপটাস পাতা নিয়ে আসে। এই পাতায় থাকা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল তেল, বাসার ছত্রাক ও পোকামাকড়ের সংখ্যা কমায়। এটি তাদের বাচ্চাদের জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে, যা একধরনের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। প্রাণীজগতে ছোট জীবদেরও ঔষধি জ্ঞান আছে। উদাহরণস্বরূপ, মৌমাছিরা তাদের চাককে জীবাণুমুক্ত করতে প্রোপলিস নামের এক ধরনের রজন ব্যবহার করে। এটিকে তারা গাছের কুঁড়ি ও বাকল থেকে সংগ্রহ করে এবং এতে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল যৌগ থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মৌচাকের মধ্যে প্রোপলিসের ঘনত্ব বাড়লে মৌমাছিদের রোগের হার কমে। গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যেও জুফার্মাকোগনোসি দেখা যায়। বিড়াল ও কুকুর প্রায়ই ঘাস খায়, বিশেষ করে যখন তাদের পেটে গ্যাস হয় বা  হজমের সমস্যা দেখা যায় বা কৃমি থাকে। ঘাসে থাকা তন্ত হজম প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে ও বমির মাধ্যমে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। মোনার্ক প্রজাপতি তাদের ডিম রাখার জন্য অ্যাসলিপিয়াস বা দুধঘাসকে বেছে নেয়, কারণ এতে থাকা রাসায়নিক যৌগ শূককীট বা লার্ভাকে ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচায়। এটি একধরনের ‘ট্রান্স জেনারেশনাল মেডিকেশন’, অর্থাৎ মায়ের বাছাই করা উদ্ভিদ সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। জুফার্মাকোগনোসি আজ শুধু প্রাণী আচরণবিজ্ঞান নয়, এটি নতুন ওষুধ আবিষ্কারের উৎস হিসেবেও দারুন গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক ভেষজ উদ্ভিদ, যেগুলি প্রাণীরা ব্যবহার করে, সেগুলিই মানুষের ওষুধ গবেষণার সূচনা করেছে। যেমন, আফ্রিকার শিম্পাঞ্জিরা যে ভারনোনিয়া পাতা খায়, সেখান থেকেই বিজ্ঞানীরা অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ওষুধ উদ্ভাবনের সূত্র পেয়েছেন।

অন্যদিকে, এই শাস্ত্র পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা প্রাণীদের প্রাকৃতিক ওষুধি উদ্ভিদ ধ্বংস করি, তাহলে তারা বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারাবে। তাই প্রাণীদের চিকিৎসাবিদ্যা ও তাদের পরিবেশ রক্ষা করা মানেই প্রাকৃতির চিকিৎসা জ্ঞানকে সংরক্ষণ করা। জুফার্মাকোগনোসি নিয়ে আধুনিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ডিএনএ বিশ্লেষণ, রাসায়নিক পরীক্ষণ এবং ব্যবহারিক পর্যবেক্ষণ একত্রে ব্যবহার করছেন। উদাহরণস্বরূপ, শিম্পাঞ্জির মল থেকে দেখা গেছে যে, ভারনোনিয়া পাতা খাওয়ার পর তাদের দেহে পরজীবীর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। এই ধরনের গবেষণা প্রমাণ করে যে, প্রাণীদের ঔষধি আচরণ শুধু কাকতালীয় নয়, বরং জৈবিক ও বিবর্তনগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।


প্রাণীদের স্বচিকিৎসা পদ্ধতি, কী এই জুফার্মাকোগনোসি

বিবর্তনবাদিরা মনে করেন যে, জুফার্মাকোগনোসি হল প্রাকৃতিক নির্বাচনেরই ফসল। যারা নিজেরা নিজেদের অসুখ সারাতে পারত, তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকত। ফলে, এই ‘ওষুধ বাছাইয়ের জ্ঞান’ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। এভাবেই প্রাণীজগতে গড়ে উঠেছে এক ‘অদৃশ্য ফার্মাসি’, যেখানে প্রতিটি প্রজাতি নিজের উপায়ে চিকিৎসাপদ্ধতি খুঁজে নিয়েছে। জুফার্মাকোগনোসি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতি নিজেই এক চিকিৎসা ভাণ্ডার। মানুষ এই জ্ঞানকে অনুকরণ করে আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছে। প্রাণীরা যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের অসুখের প্রতিকার জানত। আমরা শুধু এখন তা আবিষ্কার করছি।

যে পৃথিবীতে মানুষ ও প্রাণী একই পরিবেশ ভাগ করে, সেখানে জুফার্মাকোগনোসি (zoopharmacognosy) কেবল প্রাণীর আচরণ নয়-এটি প্রকৃতির অন্তর্নিহিত চিকিৎসা চেতনার প্রতিফলনও। অতএব, এই শাস্ত্রের গুরুত্ব কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, মানবিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিতেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের অতি আবশ্যিক কর্তব্য।

লেখক- পূর্ব বর্ধমানের আঝাপুর হাই স্কুলের সহ শিক্ষক। প্রতিবেদনটি এবিপি লাইভ কর্তৃক সম্পাদিত নয়। 

সেরা শিরোনাম

Electromagnetic Space Tiles: মহাকাশে চুম্বকের বাড়ি, এবার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পালা? বদলে যেতে পারে ভবিষ্যৎ
মহাকাশে চুম্বকের বাড়ি, এবার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পালা? বদলে যেতে পারে ভবিষ্যৎ
Science News: পশুপাখিরা কি মিথ্যে বলতে পারে? গবেষণায় নতুন তথ্য বেরোল
পশুপাখিরা কি মিথ্যে বলতে পারে? গবেষণায় নতুন তথ্য বেরোল
New Dwarf Planet Discovery: সৌরজগতে নতুন বামনগ্রহের সন্ধান মিলল, প্লুটোর প্রতিবেশী, অনেক দূর থেকে প্রদক্ষিণ করছে সূর্যকে
সৌরজগতে নতুন বামনগ্রহের সন্ধান মিলল, প্লুটোর প্রতিবেশী, অনেক দূর থেকে প্রদক্ষিণ করছে সূর্যকে
Science News: ডায়নোসর বেঁচে থাকলে পৃথিবী শাসন করতে পারত না পিঁপড়েরা, গ্রহাণু আছড়ে পড়াতেই এত বাড়বাড়ন্ত তাদের, উঠে এল গবেষণায়
ডায়নোসর বেঁচে থাকলে পৃথিবী শাসন করতে পারত না পিঁপড়েরা, গ্রহাণু আছড়ে পড়াতেই এত বাড়বাড়ন্ত তাদের, উঠে এল গবেষণায়

ভিডিও

Tulu Mondal News: গ্রেফতার রবিউল ইসলাম, টুলু মণ্ডলের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ? | Birbhum | ABP Ananda
Kalyan Banerjee:
CJP News, Bankura News | বাবার খুনের অভিযোগ তুলে এবার SP-এর দ্বারস্থ বাঁকুড়ার CJP নেতা | #abpananda
Kalyani JNM Hospital | কল্যাণীর JNM হাসপাতালে অ্যাম্বুল্যান্সের বিল ঘিরে উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ
Indranil Sen Arrest : লালবাজারে তলব ধৃত প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের মেয়েকে | #abpananda

ফটো গ্যালারি

ব্যক্তিগত কর্নার

সেরা প্রতিবেদন
সেরা রিল
Road Accident : মর্মান্তিক, প্রায় মধ্যরাতে ভ্যান ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত ৬, গুরুতর আহত কিশোর
মর্মান্তিক, প্রায় মধ্যরাতে ভ্যান ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত ৬, গুরুতর আহত কিশোর
Cyclone Alert: শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় 'মুরাসু', আগামী কয়েকদিন উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনা কতটা ?
শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় 'মুরাসু', আগামী কয়েকদিন উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনা কতটা ?
Mamata Banerjee House: প্রায় দ্বিগুণ করা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির প্রধান গেটের উচ্চতা, পুলিশ বলছে কারণ নিরাপত্তাই
প্রায় দ্বিগুণ করা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির প্রধান গেটের উচ্চতা, পুলিশ বলছে কারণ নিরাপত্তাই
LPG price : দীপাবলির আগেই বড় ধাক্কা, সিলিন্ডারের দাম কত বাড়ল কলকাতায় ? আজ কত দাম ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের?
দীপাবলির আগেই বড় ধাক্কা, সিলিন্ডারের দাম কত বাড়ল কলকাতায় ? আজ কত দাম ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের?
Astrology : ১২৮ বছর পর এমন সংযোগ ! দীপাবলির আগে এই ২ দিন অর্থের স্রোত, পাহাড়প্রমাণ লাভের যোগ ৫ রাশির
১২৮ বছর পর এমন সংযোগ ! দীপাবলির আগে এই ২ দিন অর্থের স্রোত, পাহাড়প্রমাণ লাভের যোগ ৫ রাশির
Gold Selling Tips: পুরনো সোনার গয়না বিক্রি করলেই বেশি দাম পাবেন ? ভুল ভাবছেন ! এই ৫ বিষয় আগে জানুন
পুরনো সোনার গয়না বিক্রি করলেই বেশি দাম পাবেন ? ভুল ভাবছেন ! এই ৫ বিষয় আগে জানুন
CM Suvendu Adhikari: মতুয়াদের জন্য 'কল্পতরু', কী কী প্রতিশ্রুতি মুখ্যমন্ত্রীর ?
মতুয়াদের জন্য 'কল্পতরু', কী কী প্রতিশ্রুতি মুখ্যমন্ত্রীর ?
Health Department: ফের বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর, কড়া বার্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর,
ফের বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর, কড়া বার্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর, "কিছু মাওবাদী ডাক্তারদের.."
Embed widget